জুলাই সনদ কী?
এক কথায় বললে জুলাই সনদ বা জাতীয় সনদ হলো মৌলিক সংস্কার সংশ্লিষ্ট দলিল। অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিচালনা কাঠামো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি ওঠে। এ জন্য সংবিধান থেকে শুরু করে পুলিশ বাহিনী পর্যন্ত সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন গঠন করে সরকার। এসব কমিশন এরই মধ্যে সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত। এ কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। যেটির কাজ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা। প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হলেই তা একটি সনদ বা চার্টার আকারে প্রকাশ করা হবে। অর্থ্যাৎ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাবের চূড়ান্ত রূপই হবে জুলাই সনদ বা জাতীয় সনদ। এই সনদে বলা থাকবে, কী কী সংস্কার কীভাবে হবে। এই সনদের তিনটি ভাগ রয়েছে। যথা:
- ১ম ভাগ: পটভূমি
- ২য় ভাগ: ৮৪ টি সংস্কার প্রস্তাব
- ৩য় ভাগ: সনদ বাস্তবায়নে ৭ দফা অঙ্গীকার৷
স্বাক্ষরিত হবে: ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
স্বাক্ষর করবেন: ৩০ টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিগণ।
জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্রের পার্থক্য
| বিষয় | জুলাই সনদ | জুলাই ঘোষণাপত্র |
|---|---|---|
| প্রসঙ্গ | গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা | গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি |
| প্রস্তুতকারী | জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলসমূহ | অন্তর্বর্তীকালীন সরকার |
| উদ্দেশ্য | সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ইত্যাদির সংস্কারের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা | গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, শহীদদের অবদান, আন্দোলনের চেতনা সংরক্ষণ |
| বিষয়বস্তু | ১৬৬টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৮০টিরও বেশি বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা | শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, আন্দোলনের চেতনা, ভবিষ্যতের জন্য মৌলিক আকাঙ্ক্ষা |
| আইনি মর্যাদা | সংবিধানে সংশোধন ও আইনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন | সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের মতো অংশে অন্তর্ভুক্তির আলোচনা চলছে |
| স্বীকৃতি | রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা স্বীকৃত; বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি | গণঅভ্যুত্থানের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে |
| প্রকাশের সময় | ৩০টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১৭ই অক্টোবর ২০২৫ | ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দ্বারা প্রকাশিত |
জুলাই সনদে যা থাকছে
- সনদে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমানো
- কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো
- সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের বিধান করা
- কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে দেওয়া
- আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা
- এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন এবং একই ব্যক্তি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না এমন বিধান করা
- আস্থা ভোট ও অর্থবিল ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে আইনসভায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া
- এছাড়া বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণসহ বেশ কিছু মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব আছে।
- অবশ্য এর মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবে বিএনপিসহ কোনো কোনো দলের ভিন্নমত আছে। কোন প্রস্তাবে কার ভিন্নমত আছে, তা সনদে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব বিষয়ে ঐকমত্য
প্রথম পর্বে ঐকমত্য হওয়া বিষয়ের মধ্যে আছে:
- স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন
- জেলা সমন্বয় কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা
- রাজনৈতিক দলকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা
- সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ
- সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা
- স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা
- আইনজীবীদের আচরণবিধি
- গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন
- তথ্য অধিকার আইনের সংশোধন
- দুর্নীতিবিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন
- নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
- দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে সংশোধন
- দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার নিয়োগ পদ্ধতি
- আয়কর আইনের সংশোধন ইত্যাদি।
দ্বিতীয় পর্বে ১১টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়। সেগুলো হলো:
- সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি
- নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ
- রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান
- বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ
- সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ
- উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালতের সম্প্রসারণ
- জরুরি অবস্থা ঘোষণা
- প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
- সংবিধান সংশোধন
- প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল (এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন)
- নির্বাচন কমিশন গঠন
- পুলিশ কমিশন গঠন
- নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ-সম্পর্কিত প্রস্তাব।
যেসব সিদ্ধান্তে ভিন্নমত
সনদে যেসব বিষয়ে কোনো কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট (Note of Dissent) বা ভিন্নমত আছে সেগুলোর মধ্যে আছে:
- রাষ্ট্রের মূলনীতি
- রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব
- প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা: গঠনপ্রক্রিয়া
- উচ্চকক্ষ: পিআর ও প্রার্থী তালিকা প্রকাশ
- উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকা
- নারী আসনের বিধান
- সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ (ন্যায়পাল, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক)
- দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা
- দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের একটি ধারা (নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত) সংশোধন
সাত বিষয়ে অঙ্গীকার
জুলাই সনদের শেষ অংশে আছে সনদ বাস্তবায়নে সাত দফা অঙ্গীকারনামা। এই সাত বিষয়ে অঙ্গীকার করে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে সই করবে।
১. ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
২. এই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে তফসিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে সংযুক্ত করা হবে।
৩. দলগুলো সনদের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তুলবে না।
৪. ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সাংবিধানিক তথা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
৫. গণ-অভ্যুত্থানপূর্ব ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও শহীদ পরিবারগুলোকে যথোপযুক্ত সহায়তা প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
৬. সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন করা হবে।
৭. যেসব সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো কোনো কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে।

0 comments:
Post a Comment