বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় Triffin Dilemma

ধরেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই পণ্য কেনা-বেচা, তেল কেনা বা যেকোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য US Dollar ব্যবহার করছে। ফলে বিশ্বে ডলারের চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে।

এখন সমস্যাটা হলো, এই চাহিদা মেটানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের কাছে প্রচুর ডলার সরবরাহ করতে হয়। একারণে, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশ থেকে বেশি পণ্য আমদানি করে এবং তুলনামূলকভাবে কম রপ্তানি করে। ফলে তাদের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়। যেমন ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমান ছিল প্রায় ৭.১ বিলিয়ন ডলার।

এখন, যুক্তরাষ্ট্র যদি খুব বেশি ডলার ছাপিয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে ডলারের ওপর আস্থা হারাতে পারে। এর ফলে আস্তে আস্তে ডলারের মূল্য কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ডলারের মান ঠিক রাখার জন্য, ডলারের সরবরাহ কমিয়ে দেয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত ডলার পাওয়া যাবে না। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।

এই অবস্থাটিই ট্রিফিন ডিলেমা নামে পরিচিত। এখানে একটি দেশকে দুইটি বিপরীতমুখী লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। একদিকে বিশ্ব অর্থনীতিকে সচল রাখতে পর্যাপ্ত মুদ্রা সরবরাহ করা, অন্যদিকে নিজের মুদ্রার মান ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

সহজভাবে বলা যায়, ট্রিফিন ডিলেমা হলো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে একটি দেশ যদি বিশ্বকে সাহায্য করতে চায়, তাহলে তার নিজের মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। আর যদি নিজের মুদ্রাকে রক্ষা করতে চায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি সমস্যায় পড়তে পারে।

অর্থনীতির Impossible Trinity


আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Impossible Trinity, যাকে অনেক সময় Unholy Trinity নামেও ডাকা হয়। নামটা শুনতে একটু জটিল লাগলেও এর ধারণাটি খুবই সহজ এবং অর্থনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত।

ধরুন, আপনি একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। আপনার সামনে তিনটি লক্ষ্য আছে, যেগুলো একসঙ্গে অর্জন করতে পারলে অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তিনটির মধ্যে আপনি একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুইটি বেছে নিতে পারবেন। তিনটি একসঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতাকেই বলা হয় Impossible Trinity।

এরমধ্যে প্রথম লক্ষ্য হলো ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট (Fixed Exchange Rate)। এর অর্থ, আপনি আপনার দেশের মুদ্রার মান একটি নির্দিষ্ট হারে ধরে রাখবেন। যেমন ধরুন, আপনি ঠিক করলেন ১ ডলার সবসময় ১২০ টাকার সমান থাকবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আসে। আমদানি ও রপ্তানিকারকরা আগে থেকেই জানেন তারা কত দামে লেনদেন করবেন, ফলে তাদের অনিশ্চয়তা কমে যায়।

দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো (Free Capital Flow)। এর মানে, দেশের ভেতরে এবং বাইরে টাকা অবাধে যাতায়াত করতে পারবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজেই আপনার দেশে বিনিয়োগ করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে তাদের টাকা বের করেও নিতে পারবে। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগোতে পারে।

তৃতীয় লক্ষ্য হলো স্বাধীন মুদ্রানীতি (Independent Monetary Policy)। এর মাধ্যমে আপনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদের হার বাড়াতে বা কমাতে পারবেন। যদি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, আপনি সুদের হার বাড়িয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আবার অর্থনীতি ধীরগতির হলে সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই তিনটি একসঙ্গে রাখা কেন সম্ভব নয়?

ধরুন, আপনি ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট রাখতে চান এবং একই সঙ্গে ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো চালু রাখলেন। এর পাশাপাশি আপনি নিজের মতো করে সুদের হারও নির্ধারণ করতে চাইলেন। এই অবস্থায় যদি আপনি সুদের হার কমিয়ে দেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার খোঁজে অন্য দেশে চলে যাবে। ফলে আপনার দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের হয়ে যাবে।

এইযে টাকাগুলো বেরিয়ে গেল, এই কারণে আপনার মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হবে এবং এর মান কমতে শুরু করবে। কিন্তু আপনি তো আগে থেকেই এক্সচেঞ্জ রেট ফিক্সড করে রেখেছেন। তাই সেটিকে ধরে রাখতে হলে আপনাকে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এই হস্তক্ষেপ করতে করতে একসময় আপনি দেখবেন যে, আপনার মুদ্রানীতি আর স্বাধীনভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ, আপনি তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে ধরে রাখতে পারলেন না।

এই কারণেই পৃথিবীতে যেকোনো দেশ সাধারণত তিনটির মধ্যে যেকোনো দুইটিকে বেছে নেয়।

উদাহরণ হিসেবে United States এর কথা ধরা যাক। তারা ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো এবং স্বাধীন মুদ্রানীতি বজায় রাখে, কিন্তু তাদের এক্সচেঞ্জ রেট ফিক্সড নয়। ডলারের মান বাজারের উপর নির্ভর করে ওঠানামা করে।

অন্যদিকে China দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট এবং নিজস্ব মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে, তবে তারা পুরোপুরি ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো অনুমোদন করে না।

শ্রম থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের যাত্রা

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বা K-Economy বলতে যে অর্থনীতিতে কায়িক বা শারিরীক পরিশ্রমের চেয়ে মেধা বা জ্ঞানের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কৃষি ও শ্রমিকনির্ভর অর্থনীতি বা P-Economy (Production Economy) এর ঠিক উল্টোটা।

উদাহরণ

কোন প্রকার প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াই জাপানের পক্ষে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পিছনে অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে দক্ষ জনশক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চরম উৎকর্ষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই দেশ কঠোর পরিশ্রম, সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং কারিগরি দক্ষতার বদৌলতে আজ উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত হতে পেরেছে।

শ্রমনির্ভর অর্থনীতি এবং জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির পার্থক্য

শ্রমনির্ভর অর্থনীতি জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি
তৈরি পোশাক (RMG) বিমান তৈরি
কাঁচামাল বাবদ খরচ ১০ কোটি টাকা, কিন্তু বিক্রি ২০ কোটি টাকা কাঁচামাল বাবদ খরচ ১০ কোটি টাকা, কিন্তু বিক্রি ১০০ কোটি টাকা
কাজের দ্বারা পণ্যটিতে Value Addition কম ৯০ কোটিই মেধার মূল্য

বলা হয়ে থাকে যে, অর্থনীতির তিনটি স্তর আছে।

  1. কৃষিনির্ভর অর্থনীতি
  2. শ্রমনির্ভর শিল্প
  3. জ্ঞানমূলক ও সেবামূলক অর্থনীতি

অর্থনীতিতে কৃষির অবদান প্রায় ১২ শতাংশ আর এখানে মোট জনশক্তি নিয়োজিত প্রায় ৪৫ শতাংশ, ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির প্রাথমিক পর্যায় উতরে ইতিমধ্যেই আমরা শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছি। শেষ পর্যায়ে এসে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে, তা হচ্ছে শ্রমনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া।

বলা হয়ে থাকে, একটি দেশের মাথাপিছু আয় যখন বেড়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে সে শ্রমনির্ভর শিল্প ছেড়ে দিয়ে জ্ঞাননির্ভর শিল্পের উৎপাদনে বেশি মনোনিবেশ করে।

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির উত্তরণ কেন অত্যাবশ্যকীয়

  • ডাচ ডিজিজ সংকট এড়াতে
  • এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়
  • বৈশ্বিক প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে
  • ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনে
  • অটোমেশন ও AI এর ঝুঁকি মোকাবেলায়
  • মধ্যম আয়ের ফাঁদ ঠেকাতে
  • উচ্চ আয়ের দেশে উত্তরণের পূর্বশর্ত

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি অর্জনের চ্যালেঞ্জ

  • গবেষণা ও উন্নয়নে কম বিনিয়োগ
  • ব্রেইন ড্রেইন (Brain Drain)
  • একাডেমিয়া ও শিল্প খাতের মধ্যে লিংকেজ না থাকা
  • যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম না থাকা
  • একাধিক ভাষায় দক্ষতা না থাকা
  • ডিজিটাল ডিভাইড (Digital Divide)
  • সুস্পষ্ট কোন নীতিমালা না থাকা
  • STEM (Science, Technology, Engineering, and Mathematics) এবং TVET (Technical and Vocational Education and Training) এ দক্ষতা না থাকা


দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশন এবং ম্যাক্রোইকোনমিকস

“অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকলো।” এই বাক্যটি আমাদের খুব পরিচিত। প্রায় সব রূপকথার গল্পের শেষ হয় এই বাক্য দিয়ে। সুখে-শান্তিতে বাস করার পর রূপকথায় কী হয় সেটা আমাদের জানা নেই। তবে বাস্তব জীবনে কী হতে পারে সেটার ছোট্ট একটা উদাহরণ হিসেবে ত্রিশের দশকে ঘটে যাওয়া ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর কথা বলা যেতেই পারে।

১৯২০ এর দশককে রূপকথার সেই ‘সুখে শান্তিতে বসবাস করার’ সময় বলা যেতে পারে। কারণ তখন অর্থনীতি ছিল বেশ স্থিতিশীল। ছিল পর্যাপ্ত চাকরি, আয় এবং স্থির মূল্যস্তর (Stable price level)। ১৯২০-২৮ সাল পর্যন্ত সবাই একরকম সুখে-শান্তিতে বাস করলেও বাস্তব যেহেতু রূপকথার মতো না, তাই ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে ঘটে যাওয়া আমেরিকার স্টক মার্কেটে ধস থেকেই আমরা দেখতে শুরু করি বাস্তব জীবনে ‘সুখে শান্তিতে বসবাস করা’র পর কী হতে পারে। এই স্টক মার্কেট ধসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন, যেটা চলতে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। যে মন্দাটা হয়ে ওঠে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ আর ভয়ংকর অর্থনৈতিক মন্দা। পরবর্তীতে ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদেরা যাকে আখ্যা দিয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক ঘটনা বলে।

এই মহামন্দার ফলে বেকারত্ব বেড়ে যায়, প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ তাদের চাকরি হারায়। প্রাইস লেভেলের সাথে প্রোডাকশন লেভেলেও একটা ধস নামে। আর এই সবগুলো মিলে ঘটে ভয়ানক অর্থনৈতিক পতন। অর্থনীতিবিদরা ক্লাসিক ইনভিজিবল হ্যান্ড (Invisible hand) তত্ত্ব প্রয়োগ করে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেছিলেন, তবে কোনো লাভ হয়নি তাতে।

কেন ক্লাসিক্যাল মডেল কাজ করলো না?

যেহেতু প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ চাকরিহারা হয়েছেন, তাই অর্থনীতিবিদেরা ভাবলেন, শ্রমবাজারে (Labor market) একটা উদ্বৃত্ত তৈরী হবে। কারণ হঠাৎ করে এত বেকার তৈরি হওয়ায় চাহিদার চেয়ে যোগান বেড়ে গিয়েছে। ফলে কম মজুরিতে ফার্মগুলো তাদের কাজে নিতে পারবে। এতে ফার্মগুলো বেশি মানুষ নিয়ে তাদের উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং সেগুলো বিক্রি করে তাদের ক্ষতিও কিছু পুষিয়ে নিতে পারবে।

কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি দিয়ে একটা প্রশ্ন তৈরি হলো, “উৎপাদিত পণ্যগুলো কিনবে কারা?” যেহেতু ফার্মগুলো কম মজুরিতে মানুষকে চাকরি দেবে, তাই চাকরি পাওয়ার পরেও তাদের রোজগার তেমন বাড়বে না। ফলে বেশি উৎপাদন করেও লাভ হবে না, কারণ মানুষের হাতে অর্থ নেই। আর তাই ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির এই আইডিয়া একদমই কাজে লাগলো না। ওদিকে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে লাগল।

ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৩০ সালে বেকারত্বের হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল। সে বছর দেড় মিলিয়ন থেকে প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ তাদের চাকরি হারায়। অবস্থা যখন দিন দিন খারাপ হচ্ছে, ১৯৩৬ সালে জন মেনার্ড কেইনস নামে এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, যাকে পরবর্তীতে বলা হবে ম্যাক্রোইকোনমিকসের জনক, একটি বই প্রকাশ করেন যার নাম ‘The General Theory of Employment, Interest and Money’। কেইনস এই বইয়ে ক্লাসিক ইকোনমিক মডেলকে চ্যালেঞ্জ করলেন। শুধু তা-ই না, নিজেও কিছু পরামর্শ দিলেন এই ক্রান্তিকাল থেকে উত্তরণের জন্য। বললেন, যেহেতু পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাই মূল্য এবং মজুরির চেয়ে সামষ্টিক চাহিদা বাড়ানোর ব্যাপারটি আমলে নেয়া উচিত এবং ক্লাসিক ইকোনমিক থিওরি ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের উচিত হস্তক্ষেপ করা।

সরকার কীভাবে সামষ্টিক চাহিদা বৃদ্ধি করবে?

যেহেতু মানুষের কাছে অর্থ ছিল না তাই বড় একটা প্রশ্ন ছিল, পণ্যগুলো কারা কিনবে। কেইনস এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাড়িয়ে দিতে বললেন সামষ্টিক চাহিদা।

সাধারণত মানুষের কাছে যখন অর্থ, ভোগ করার উদ্দেশ্য এবং কিছু কেনার ইচ্ছা থাকে, তখন তার কোনো পণ্য বা সেবার প্রতি চাহিদা তৈরি হয়। যদি তার কাছে অর্থ না থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সে কিছু কিনবে না। এই অবস্থায় সরকার চাকরির সুযোগ তৈরি করে মানুষকে অর্থোপার্জনের ব্যবস্থা করে দিতে পারে যেন পণ্য বা সেবার চাহিদা সৃষ্টি হয়। সরকার কীভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে? উত্তর হতে পারে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান করে, ট্যাক্স কমিয়ে কিংবা উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে।

কেইনসের অবদান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর, বিশেষ করে ‘৫০-এর দশকে কেইনসিয়ান ভিউ অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। সরকার বিশ্বাস করতে শুরু করে- কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে। এ কারণে এবং আরেকটা মহামন্দার আশঙ্কায় আমেরিকার কংগ্রেসে ১৯৪৬ সালে ‘The Employment Act of 1946’ গঠিত হয়। এই আইনটি ধারণ করেছে ম্যাক্রোইকোনমিকসের মূল তিনটি প্রশ্নকে:

১) কেন উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান কখনও কখনও হ্রাস পায় এবং কীভাবে বেকারত্ব হ্রাস করা যায়?

২) মূল্যস্ফীতির উৎস কী কী এবং কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?

৩) কোনো দেশ কীভাবে তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয়েছে ম্যাক্রোইকোনমিকসের লক্ষ্য:

১) উৎপাদন বৃদ্ধি,

২) স্থিতিশীল মূল্যস্তর, এবং

৩) উচ্চ কর্মসংস্থান এবং নিম্ন বেকারত্ব বজায় রাখা।

শেষ কথা

রূপকথার গল্পের শেষে সবাই সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকে বলেই এরপর আর গল্প নেই। এর আগে নানা রকম সমস্যা আছে বলেই সেগুলো আমরা আগ্রহ নিয়ে শুনি। বাস্তব জীবনে এরকম হ্যাপি এন্ডিং নেই বলে কিছুকাল সুখের পর ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর মতো নতুন কোনো সমস্যা হাজির হয়। সেই সমস্যাগুলো যতটা আমাদের ঝামেলায় ফেলে, তারচেয়েও বেশি এনে দেয় নতুন কোনো সম্ভাবনা। দিনশেষে আমরা পাই নতুন পথের সন্ধান। আর এভাবেই চলেছে আমাদের জীবন, আমাদের সভ্যতা।

অরিজিনাল আর্টিকেল: https://archive.roar.media/bangla/main/economy/the-beginning-of-macroeconomics