জাতিসংঘের ২০২৫ সালের টেকসই উন্নয়ন (SDG) প্রতিবেদন ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (SDGs) বাস্তবায়নে বিশ্ব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রকাশিত “দ্য সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস রিপোর্ট ২০২৫” বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে এক কঠিন বাস্তবতা:

  • মাত্র ৩৫% লক্ষ্য সঠিক পথে আছে,
  • ৫০% ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে,
  • এবং ১৮% লক্ষ্য ২০১৫ সালের সূচকের তুলনায় পিছিয়ে গেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে আখ্যা দিয়েছেন "A Global Development Emergency" হিসেবে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি:

বাংলাদেশ গত এক দশকে টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
  • শিশু মৃত্যুহার হ্রাস,
  • নারীর স্কুলে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি,
  • সর্বজনীন বিদ্যুতায়ন,
  • এবং টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন।
এসবই বাংলাদেশের ইতিবাচক অগ্রগতির প্রতিফলন। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক প্রকল্পগুলোর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত।

তবে এই অগ্রগতির বিপরীতে কিছু মৌলিক সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে:
  • জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ,
  • কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট,
  • বৈশ্বিক ঋণচাপ ও মুদ্রাস্ফীতি,
  • এবং তথ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা
এসব বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অগ্রাধিকারের ছয় খাতে বাংলাদেশের অবস্থান

জাতিসংঘ ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ছয়টি খাতকে দ্রুত উন্নয়নের জন্য চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই খাতগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ:

১. খাদ্য ব্যবস্থা: ধান উৎপাদনে সাফল্য, কিন্তু পুষ্টি ঘাটতি প্রকট

  • ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন একটি বড় অর্জন হলেও শিশুদের খর্বাকৃতি, অপুষ্টি এবং নারীদের খাদ্য বৈচিত্র্যের অভাব এখনো গুরুতর সমস্যা।

  • ছোট কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি, বিমা সুবিধা এবং বাজার সংযোগ থেকে বঞ্চিত।

  • জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উৎপাদনশীলতা হুমকির মুখে।

করণীয়জলবায়ু-সহনশীল ফসল, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ, এবং পুষ্টিনির্ভর খাদ্য নীতিমালা গ্রহণ জরুরি।

২. জ্বালানি: বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে পিছিয়ে

  • দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় এলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সীমিত।

  • গ্রামীণ অঞ্চলে আজও কাঠ, খড়, কেরোসিন ব্যবহৃত হচ্ছে।

করণীয়সবুজ বিনিয়োগ, বায়োগ্যাস ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, এবং জ্বালানি ভর্তুকি কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন।

৩. ডিজিটাল সংযুক্তি: অগ্রগতি আছে, কিন্তু বিভাজনও

  • অনলাইন সংযোগ ৭০%+, মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-গভর্ন্যান্স ব্যবহারে বৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়।

  • কিন্তু গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারীরা ও প্রবীণরা এখনও ডিজিটাল ব্যবস্থার বাইরে।

করণীয়ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি, সুলভ ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৪. শিক্ষা: ভর্তির হার বেড়েছে, গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ

  • প্রাথমিক পর্যায়ে লিঙ্গসমতা অর্জন প্রশংসনীয় হলেও শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

  • কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ-অনুধাবন এবং গণিতে দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

করণীয়শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, সৃজনশীল পাঠ্যক্রম এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

৫. কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা: অনানুষ্ঠানিক খাতই প্রধান

  • অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন—নেই নিশ্চয়তা, সুরক্ষা বা স্থায়িত্ব।

  • কিছু সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প থাকলেও এগুলোর আওতা কম এবং রাজনৈতিক প্রভাব প্রবল।

করণীয়দক্ষতা উন্নয়ন, এসএমই খাতে বিনিয়োগ, এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

৬. জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য: অস্তিত্বের প্রশ্ন

  • ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি বেড়েই চলেছে।

  • সুন্দরবন ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা হুমকির মুখে।

  • আন্তর্জাতিক সহায়তা না থাকায় অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়নে সমস্যা।

করণীয়আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা, স্থানীয় অভিযোজন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন।

তথ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা: নীতি নির্ধারণে বড় বাধা

কার্যকর টেকসই উন্নয়ন কাঠামোর জন্য নির্ভুল, সময়োপযোগী ও উন্মুক্ত তথ্য অপরিহার্য।

  • বাংলাদেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে দাতানির্ভর ডেটার ওপর নির্ভর করে।

  • ৩৯টিরও বেশি SDG সূচক তথ্য সংকটে পড়েছে, বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, নারী নির্যাতন ও বস্তিবাসীর জীবনযাপন বিষয়ে।

করণীয়জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

0 comments:

Post a Comment