জাতিসংঘ ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর ৫১টি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করে, বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১৯৩। বাংলাদেশ ১৩৬তম সদস্য। প্রায় ৮০ বছর ধরে সংস্থাটি বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। UNICEF, WHO, FAO, UNESCO, WFP, UNDP প্রভৃতি অঙ্গসংস্থাগুলোর মাধ্যমে জাতিসংঘ দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুধা দূরীকরণ ও মানব উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এবং একাধিকবার নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে।
৮০ বছরে জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য সফলতা:
- কঙ্গোতে (MONUSCO) গৃহযুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ
- দক্ষিণ সুদানে শান্তি প্রতিষ্ঠা
- Universal Declaration of Human Rights (1948)
- Human Rights Council গঠন (2006)
- UNICEF-এর "Child Survival Revolution"
- UNHCR-এর ৭০+ মিলিয়ন শরণার্থী সহায়তা
- Millennium Development Goals (MDGs) (2000-2015)
- Sustainable Development Goals (SDGs) (2015-2030)
- গুটিবসন্ত নির্মূল (1980 ঘোষণা)
- COVID-19 মোকাবিলায় COVAX উদ্যোগ (2020)
- International Court of Justice (ICJ) এর মাধ্যমে ভারত-পর্তুগাল ও নিকারাগুয়া মামলা নিষ্পত্তি
- UNFCCC গঠন (1992)
- Paris Climate Agreement (2015)
- UNESCO-র "World Heritage Sites" প্রোগ্রাম
- Education for All আন্দোলন
- বাংলাদেশের শরণার্থী সহায়তা (১৯৭১)
- হাইতি ভূমিকম্পের পর মানবিক ত্রাণ (2010)
- কিউবা সংকট (1962) এর পর সংলাপ
- ইরান এর পারমাণবিক আলোচনায় IAEA ও UN-এর ভূমিকা
জাতিসংঘের প্রধান ব্যর্থতাসমূহ:
১। বড় শক্তিগুলোর প্রভাব ও ভেটো পাওয়ার: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্সের ভেটো ক্ষমতার কারণে জাতিসংঘ প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে। কোনো একটি দেশ আপত্তি জানালেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না।
২। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলা চালায়। জাতিসংঘ তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে ১০ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়।
৩। ফিলিস্তিন ইস্যু: ইসরায়েলের আগ্রাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রভাবে ইসরায়েল প্রায় দায়মুক্ত থেকে যায়।
৪। রোহিঙ্গা সংকট: মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়ন রোধে ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে।
৫। কাশ্মীর ইস্যু: ভারত-পাকিস্তান বিরোধে জাতিসংঘ এখনো কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারেনি।
৬। রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার গণহত্যা: ১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডা ও সেব্রেনিৎসায় গণহত্যা চলাকালে জাতিসংঘ কার্যত দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
৭। লিবিয়া, সোমালিয়া ও অন্যান্য সংঘাত: এসব দেশে সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষায় বা সংঘাত থামাতে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
৮। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) দুর্বলতা: আদালতের রায় বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই। ইসরায়েল বা বড় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে রায় দিলেও তা কার্যকর হয় না।
৯। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) সীমাবদ্ধতা: পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
১০। নিরাপত্তা পরিষদের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের অভাব: ইউরোপের প্রতিনিধিত্ব ৬০%, অথচ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কোনো স্থায়ী সদস্য নেই। এশিয়ার বিশাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও মাত্র একটি দেশ (চীন) স্থায়ী সদস্য। এতে বিশ্ব প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
১১। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার না হওয়া: ৮০ বছরেও নিরাপত্তা পরিষদের গঠন পরিবর্তন হয়নি। ভারত, জাপান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর কোনো স্থায়ী আসন নেই। ফলে জাতিসংঘ আজ “পাঁচটি বৃহৎ রাষ্ট্রের সংগঠন (P5)” হয়ে পড়েছে।
১২। মহাসচিবের ক্ষমতাহীনতা: জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যত তেমন কোনো ক্ষমতাই দেওয়া হয়নি। সনদের অনুচ্ছেদ ৯৯ এ মহাসচিবকে কেবল সামান্য ক্ষমতা দেওয়া হয়। অনুচ্ছেদ ৯৯ এ বলা হয় - মহাসচিব যদি মনে করেন যে কোনো ঘটনা, সংঘর্ষ, মানবিক সংকট বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, তিনি নিজ উদ্যোগে এটি নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করতে পারেন।
The Secretary-General may bring to the attention of the Security Council any matter which in his opinion may threaten the maintenance of international peace and security.Article 99, UN Charter
জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অসংখ্য সাফল্য অর্জন করলেও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় কাঠামোগত দুর্বলতা, ভেটো পাওয়ার ইত্যাদির কারণে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রাখতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও বিচার কাঠামোর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
জাতিসংঘের (প্রধানত - UNSC) প্রয়োজনীয় সংস্কার:
- পরিষদের মেয়াদ, সদস্যসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্ব-ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
- নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। প্রত্যেক মহাদেশ থেকে আনুপাতিক পদ্ধতিতে স্থায়ী সদস্যে নেওয়া যেতে পারে। যেমন বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদে মুসলিম বিশ্বের কোনো প্রতিনিধি নেই। এছাড়া ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশেরও কোনো সদস্য নেই।
- স্থায়ী সদস্যদের ভেটো পাওয়ার নিয়ন্ত্রণ অথবা সীমাবদ্ধ করা। যেমনঃ যেসব বিষয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার মতো ঝুঁকি আছে, সেখানে একক ভেটো ব্যবহার সীমিত করা প্রয়োজন।
- মহাসচিবের তেমন কোনো ক্ষমতাই কার্যত রাখা হয়নি।
- ত্রুটিপূর্ণ চাঁদা ব্যবস্থা থাকায় অধিক চাঁদা প্রদানকারী রাষ্ট্রগুলোর একচেটিয়া প্রভাব বিদ্যমান। তাই চাঁদা ব্যবস্থা সংস্কার করা প্রয়োজন।
- সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ, সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও ইনক্লুসিভ হওয়া প্রয়োজন।
- শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর ক্ষেত্রে অধিক যুগোপযোগী কার্যকর কাঠামো দরকার। এছাড়া নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হুমকি, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদিতে সংস্থার মনোযোগ বাড়ার দাবি রয়েছে।
- এছাড়া পরিষদের কার্যপ্রণালী আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সময়োপযোগী হওয়া উচিত।
গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সম্ভাব্য ভূমিকা
১। মানবিক সহায়তা ও অস্ত্রবিরতি নিশ্চিত করা
-
জাতিসংঘকে মানবিক স্থায়ী অস্ত্রবিরতি (Humanitarian Ceasefire) বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে হবে।
-
UN Office for the Coordination of Humanitarian Affairs (OCHA) ও World Food Programme (WFP) এর মাধ্যমে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয় সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো প্রয়োজন।
-
UNRWA (United Nations Relief and Works Agency) কে আরও সম্পদ ও রাজনৈতিক সহায়তা দিতে হবে যেন তারা গাজার বেসামরিক জনগণকে কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারে।
২। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষা
-
জাতিসংঘের Human Rights Council ও International Criminal Court (ICC) এর সঙ্গে সমন্বয় করে
যুদ্ধাপরাধ, বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। -
ইজরায়েলকে Geneva Convention (১৯৪৯) ও আন্তর্জাতিক মানবিক অন্যান্য আইনের প্রতি দায়বদ্ধ করতে হবে।
৩। কূটনৈতিক মধ্যস্থতা ও রাজনৈতিক সমাধান
-
জাতিসংঘের Special Coordinator for the Middle East Peace Process (UNSCO) কে সক্রিয় করে
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। -
Two-State Solution (Oslo Accord 1993) এর পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে আঞ্চলিক অংশীদার যেমন মিশর, জর্ডান, কাতার ইত্যাদি দেশের সঙ্গে যৌথ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
৪। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
-
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের জন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি International Reconstruction Task Force গঠন করা যেতে পারে।
-
UNDP ও World Bank এর সহযোগিতায় অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুননির্মাণে সহায়তা করতে হবে।
৫। নিরপেক্ষ শান্তিরক্ষী উপস্থিতি
-
জাতিসংঘ একটি International Monitoring Mission বা Peacekeeping Force পাঠিয়ে সীমান্তে অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণ ও নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তবে ইতিমধ্যে মিশরের নেতৃত্বে একটি শান্তিরক্ষা বাহিনী গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
অতীতে লেবাননে [United Nations Interim Force in Lebanon (UNIFIL) - 1978] এমন মডেল সফলভাবে কাজ করেছে। গাজাতেও অনুরূপ কাঠামো প্রযোজ্য হতে পারে।

0 comments:
Post a Comment