উপদেষ্টা পরিষদ গত ২৩ অক্টোবর ২০২৫ এ বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধিত) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শ্রম আইনকে আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানসম্মত এবং শ্রমিক ও উদ্যোক্তা উভয় পক্ষের জন্য অধিক ভারসাম্যপূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
প্রধান বিষয়বস্তু
- গৃহকর্মী ও নাবিকদের শ্রমিক হিসেবে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, ফলে তারা এখন আইনি সুরক্ষা পাবেন।
- বেসরকারি খাতে (বিশেষত ১০০ বা তার বেশি শ্রমিকের কারখানায়) প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
- ন্যূনতম মজুরি এখন প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করা হবে (আগে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হতো)। মুদ্রাস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করা হবে।
- বাধ্যতামূলক শ্রম (forced labor) পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত (blacklisting) করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
- ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। ইউনিয়ন গঠনের জন্য ন্যূনতম সদস্য সংখ্যা কমানো, একই কারখানায় একাধিক ইউনিয়নের সুযোগ এবং সমষ্টিগত দরকষাকষির (collective bargaining) নিয়ম সহজ করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিউন গঠনে -
- ২০-৩০০ শ্রমিক থাকলে ২০ জনের সম্মতি
- ৩০১-৫০০ শ্রমিক থাকলে ৪০ জনের সম্মতি
- ৫০১-১৫০০ শ্রমিক থাকলে ১০০ জনের সম্মতি লাগবে
- নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে (প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সময় বাড়ানো হয়েছে)। মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
- “শ্রমিক”, “গৃহকর্মী”, “নাবিক”, “কালো তালিকাভুক্তকরণ”, “সহিংসতা ও হয়রানি” প্রভৃতি নতুন সংজ্ঞা আইনটিতে যুক্ত করা হয়েছে।
- বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (Alternative Dispute Resolution - ADR) প্রবর্তন করা হয়েছে।
- সরকারি বিধির মাধ্যমে কর্মস্থলে দুর্ঘটনা জনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রতিষ্ঠা করা হবে।
- আইনটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর কনভেনশন ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনার (National Action Plan) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত হয়েছে।
- যদিও এই সংশোধনে মূলত আনুষ্ঠানিক (formal) খাতের শ্রমিকদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অনেক অনানুষ্ঠানিক (informal) খাত এখনো আইনের পূর্ণ আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
এই শ্রম সংশোধনী বাংলাদেশের শ্রম-আইনকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, কল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এই উদ্দেশ্যগুলি এ প্রকল্পে স্পষ্ট। তবে শুধু আইন থাকলেই হয় না; কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়োগকর্তার দায়িত্বশীলতা, শ্রমিকদের সচেতনতা এসব একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যদি সংশোধিত আইন শুধু কাগজে-কলমে থেকে যায় এবং বাস্তবে প্রয়োগ না হয়, তবে তার সুফল আদতে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাবে না।

0 comments:
Post a Comment