জাতিসংঘ গণহত্যা নিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশন - ১৯৪৮
গণহত্যা কনভেনশন (Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide) হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যা গণহত্যা (genocide) রোধ, দমন ও শাস্তির জন্য গৃহীত হয়েছিল। একে সংক্ষেপে Genocide Convention - 1948 বলা হয়। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে এই কনভেনশনে যুক্ত হয়। এতে মোট ১৯টি অনুচ্ছেদ (Articles) রয়েছে।
১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটি গৃহীত হয়। এই কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২(১) অনুযায়ী গণহত্যা বলতে ৫টি ঘটনাকে বোঝায়। এর যেকোনো একটি ঘটলেই গণহত্যা হয়েছে বলে গণ্য হবে। গণহত্যা হলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নিম্নোক্ত কাজগুলো:
- ওই গোষ্ঠীর মানুষদের হত্যা করা
- তাদের শারীরিক বা মানসিকভাবে গুরুতর ক্ষতি করা
- এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে তারা ধ্বংস হয়ে যায় (যেমন: খাদ্য, পানি, চিকিৎসার ঘাটতি)
- জোর করে জন্ম নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করা
- শিশুদের জোর করে অন্য গোষ্ঠীতে স্থানান্তর করা
এই কনভেনশনে নিন্মোক্ত বিষয়গুলোতে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
- গণহত্যা সংঘটন
- গণহত্যার পরিকল্পনা করা
- গণহত্যার চেষ্টা করা
- গণহত্যার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্ধন যোগানো ইত্যাদি।
গণহত্যা কনভেনশনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ
Universal Declaration of Human Rights (UDHR) - ১৯৪৮
Universal Declaration of Human Rights (UDHR) বা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে। এটি বিশ্বের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার দলিল, যেখানে সব মানুষের জন্য সমান মর্যাদা ও অধিকার এর কথা বলা হয়েছে। যদিও এর আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও নৈতিক, মানবিক ও রাজনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধে ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ, ১ কোটি মানুষের প্রাণনাশ, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের নির্যাতন, আরব-ইসরায়েল প্রথম যুদ্ধ (১৯৪৮) এগুলো মূলত UDHR তৈরিতে উৎসাহ ও সাহায্য করে। এই সনদের মোট ধারা ৩০ টি।
যুদ্ধ সম্পর্কিত জেনেভা কনভেনশন - ১৯৪৯
জেনেভা কনভেনশন, ১৯৪৯ (Geneva Convention of 1949) হলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল, যা যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষ, আহত সৈনিক, যুদ্ধবন্দী এবং চিকিৎসা কর্মীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ১৯৪৯ সালে পূর্বেকার ৩টি কনভেনশনের (১৮৬৪, ১৯০৬, এবং ১৯২৯) পরিমার্জন ও সম্প্রসারণ করে এই কনভেনশনটি বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমানে ১৯৬টি দেশ এই কনভেনশন অনুমোদন (Ratified) করেছে।
১৯৪৯ সালের চারটি চুক্তির বিষয়বস্তু:
শরনার্থী বিষয়ক জেনেভা কনভেনশন - ১৯৫১
জেনেভা কনভেনশন - ১৯৫১ (1951 Refugee Convention) হলো শরণার্থীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবিক সংকট মোকাবেলায় গৃহীত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এখনো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নাই।
কনভেনশনের ১ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শরনার্থী হবেন যিনি -
- সশস্ত্র লড়াই বা নিপীড়ন থেকে বাঁচতে দেশ থেকে পালিয়ে যান।
- দেশ ত্যাগের পর দেশে ফিরে গেলে জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
- বর্ণবাদ, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা সামাজিক কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হন।
- দেশে স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে ভয় পান।
শরনার্থী কনভেনশন অনুযায়ী একজন শরনার্থী যেসব অধিকার পাবেনঃ
- তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
- সামাজিক আবাসন সুবিধা।
- সামাজিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন সুবিধা।
- কাজের ব্যবস্থা পাবেন।
কনভেনশনের গুরুত্বঃ
- এটি আন্তর্জাতিকভাবে শরনার্থীদের জন্য একটি মৌলিক অধিকার কাঠামো তৈরি করে।
- শরনার্থীরা অন্য দেশে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা লাভ করে।
- তাদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
- জাতিসংঘের শরনার্থী সংস্থা (UNHCR) এই কনভেনশন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
CEDAW: নারীর অধিকার সুরক্ষায় একটি বৈশ্বিক চুক্তি
নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণে বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো CEDAW (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women)। এটি জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যা ১৯৭৯ সালে অনুমোদিত হয় এবং ১৯৮১ সালে কার্যকর হয়। বিশ্বের অনেক দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে এই চুক্তি অনুমোদন করে।
CEDAW-এর মূল লক্ষ্য:
CEDAW মূলত নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সমাজে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। এটি রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানায় যেন তারা নারী-পুরুষের মধ্যে আইনি, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা করে।
CEDAW-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ:
অনুচ্ছেদ ১: বৈষম্যের সংজ্ঞানারীর প্রতি "বৈষম্য" বলতে এমন কোনো পার্থক্য বা সীমাবদ্ধতা বোঝায় যা নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা উপভোগে বাধা সৃষ্টি করে।
অনুচ্ছেদ ২: বৈষম্য নির্মূলরাষ্ট্রগুলোকে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করতে আইন প্রণয়ন, বিচারিক নিরাপত্তা, এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৫: লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তনএই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষের ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে লিঙ্গ সমতা অর্জনের উদ্যোগ নিতে হবে।
অনুচ্ছেদ ৭: রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণনারীদের ভোটাধিকার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার এবং সরকারের সব স্তরে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১০: শিক্ষা অধিকারনারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ, পাঠ্যক্রম, ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১১: কর্মসংস্থান অধিকারনারীদের জন্য সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মস্থলে যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১৬: বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে সমতাএই অনুচ্ছেদে বলা হয়, বিবাহে প্রবেশ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তান প্রতিপালনসহ পারিবারিক বিষয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশ CEDAW চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা যেমন অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬-এর কিছু অংশে সংরক্ষণ (reservation) রেখেছে। অর্থাৎ, কিছু শর্তে বাংলাদেশ এখনও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি।
তবে ইতোমধ্যেই নারী শিক্ষা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নারী উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন CEDAW-এর চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
CEDAW একটি নারীবান্ধব সমাজ গঠনের আন্তর্জাতিক ভিত্তি। নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে CEDAW-এর অনুচ্ছেদসমূহ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত জাতীয় নীতিমালাকে CEDAW-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা এবং সংরক্ষণ প্রত্যাহারের মাধ্যমে নারীর সার্বিক অধিকার নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিষয়ক রোম চুক্তি - ১৯৯৮
রোম চুক্তি (Rome Statute of the International Criminal Court - ICC) হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার আইসিসিতে করা যায়। এর মোট সদস্য ১২৪ টি দেশ। গৃহিত হয় ১৯৯৮ সালে, এবং ২০০২ সালে কার্যকর হয়। মূলত ২০০২ সালে আইসিসি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি কার্যকর হয়। বাংলাদেশ ২০২০ সালে রোম চুক্তিতে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করে। উল্লেখ্য, আইসিসির হেডকোয়াটার নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ৪টি অপরাধের বিচার করা হয়, যথাঃ
- গণহত্যা (জেনোসাইড)
- মানবতাবিরোধি অপরাধ (Crime Against Humanity)
- যুদ্ধাপরাধ (War Crimes)
- আগ্রাসন (Aggression)
- খুন
- গুম
- নির্যাতন
- দাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রম
- শ্রেণিবৈষম্য
- রাজনৈতিক বিরোধী দলের উপর নির্যাতন
- মানব পাচার
- জোরপূর্বক স্থানান্তর বা নির্বাসন
- জাতিগত নিপীড়ন বা জোরপূর্বক ধর্মান্তর
রোম চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকঃ
- ব্যক্তির বিচারঃ এটি রাষ্ট্র নয় বরং ব্যক্তির বিচার করে। যেমন রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক কর্মকর্তা ইত্যাদি।
- অভিযোগ দায়েরঃ রাষ্ট্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) অথবা আদালতের নিজস্ব প্রসিকিউটর অভিযোগ আনতে পারে।
- রেট্রোএকটিভ নয়ঃ আদালত কেবল চুক্তির কার্যকারিতার পরে সংঘটিত হওয়া অপরাধের বিচার করতে পারে।
জাতিসংঘ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ - ২০০৬
জাতিসংঘ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ (International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance) হচ্ছে একটি জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি যা গুম প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে কাজ করে।
জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদটি ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ৩২টি দেশ এটি অনুস্বাক্ষর করার পরে ২০১০ সালে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়। সামগ্রিকভাবে এই সনদের লক্ষ্য গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দেওয়া। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৭৭টি দেশ এই সনদে যুক্ত হয়েছে (বাংলাদেশ ৭৬ তম, সর্বশেষ পোল্যান্ড - ২০২৪ সালে)। এতে মোট ৪৫ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে।
জাতিসংঘ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের উদ্দেশ্য:
- বলপূর্বক গুম (Enforced Disappearance) প্রতিরোধ করা
- গুমের শিকারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা
- দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা
- ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা
সনদে কী কী বাধ্যবাধকতা রয়েছে?
- গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
- সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা
- গুমের শিকারদের সন্ধান ও মুক্তি
- পরিবারের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া
- শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। এ কারণে অনেক মানবাধিকার সংস্থা দাবি জানিয়ে আসছে, বাংলাদেশ যেন এই সনদটি অনুসমর্থন করে, যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার এবং প্রতিরোধের পথ সুগম হয়। তার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় যমুনায় উপদেষ্টামণ্ডলীর সাপ্তাহিক সভায় এই কনভেনশনে সই করেন ড. ইউনূস।







0 comments:
Post a Comment