পানি বিষয়ক কয়েকটি আন্তর্জাতিক সনদ ও কনভেনশন

বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যা

  • আন্তর্জাতিক নদী আইন ও আন্ত-সীমান্ত নদীর পানি বন্টন আইনের প্রেক্ষিতে ভারত-বাংলাদেশ পানি বন্টণ ও প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসে ভারত একতরফাভাবে দায়ী।
  • ভারত-বাংলাদেশ পানি বন্টন চুক্তি,  জয়েন্ট রিভার কমিশনের (JRC) গঠনের পরও ভারত কখনও আমাদের ন্যায্য হিস্যা প্রদান করেনি। এমনকি পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভারত,  বাংলাদেশে কৃত্রিম মরুকরণ ও ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে চলেছে।
  • যেহেতু ভারত উজানের দেশ এবং যথেচ্ছা পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার হরণ করেছে এবং প্রাণ-প্রকৃতিকে হুমকীর মুখে ফেলে দিয়েছে, তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক আইনে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং সুসংগঠিত কূটনীতি পরিচালনার মাধ্যমে ভারতকে চাপে রেখে এই সমস্যার সমাধান করা।
  • এক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে চীনকে যুক্ত করা, বাংলাদেশ-নেপাল-পাকিস্তান-ভারত-চীন-মিয়ানমার-ভূটান  এ ৭টি দেশ মিলে একটি নতুন নদী কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যেন একতরফা পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত না হয়।
  • বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে ধীরে ধীরে কঠোর অবস্থানে যাওয়া।

হেলসিংকি সনদ - ১৯৬৬

হেলসিংকি সনদ ১৯৬৬ যা ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নদী আইন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই সনদের ৪ ও ৫ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী -
আন্তর্জাতিক নদী বা সীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পানি বন্টনের ক্ষেত্রে পারস্পারিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবে।  উজানের দেশ এমন কোন পদক্ষেপ নিবেনা অর্থাৎ পানি প্রবাহকে এমনভাবে ব্যহত করবে না যাতে ভাটির প্রাণ-প্রকৃতি হুমকীর মুখে পড়ে। জরুরী অবস্থা বিবেচনায় পানি ছাড়ার ক্ষেত্রে উজানের দেশ ভাটির দেশের কোল্যাটেরাল ড্যামেজ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে অবশ্যই ভাটির দেশকে আগেই জানিয়ে রাখবে।
এই ক্লজগুলো পরে ইউনেস্কো কতৃক স্বীকৃত হয় এবং সদস্য দেশগুলোকে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়।

রামসার কনভেনশন - ১৯৭১

রামসার কনভেনশন হচ্ছে জলাভূমি সংরক্ষণ বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোর সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালে এই কনভেনশনে যোগ দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি রামসার সাইট রয়েছে:

  • সুন্দরবন, যা ১৯৯২ সালে অন্তর্ভুক্ত।
  • টাঙ্গুয়ার হাওর, যা ২০০০ সালে রামসার ভুক্ত হয়।

সমুদ্র আইন সম্পর্কিত UNCLOS III - ১৯৮২

জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সম্মেলন বা UNCLOS (United Nations Convention on the Law of the Sea) হলো আন্তর্জাতিক সমুদ্র ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে অধিক স্বীকৃত কনভেনশন। এটি তিনটি পর্বে বিভক্ত: UNCLOS I (১৯৫৮), UNCLOS II (১৯৬০, কোনো নতুন চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি এবং এই সম্মেলন সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ বলে বিবেচিত হয়) এবং UNCLOS III। এর মধ্যে UNCLOS III (১৯৮২) এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত সমুদ্র আইন কাঠামো। এটি প্রায় ১৬০টিরও বেশি দেশ মেনে চলে। এতে 
  • রাজনৈতিক সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল
  • এক্সক্লুজিভ ইকোনমিক জোন (EEZ) ২০০ মাইল
  • এবং মহীসোপান ৩৫০ মাইল
পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক সমুদ্রতলের সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য International Seabed Authority (ISA) গঠন করা হয় এবং সমুদ্র সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য International Tribunal for the Law of the Sea (ITLOS) প্রতিষ্ঠা করা হয়।


জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন - ১৯৯৭

জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন (United Nations Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses) ২১ মে ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। এই কনভেনশন আন্তর্জাতিক নদী ও পানিপ্রবাহ ব্যবস্থার ওপর নদী তীরবর্তী দেশগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণে কাজ করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির সরবরাহ, কৃষি, জলবিদ্যুৎ, ও পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে সহযোগিতা, ন্যায্যতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

এই কনভেনশন অনুযায়ী, প্রতিটি দেশকে ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসংগত ব্যবহার, অন্য দেশের ক্ষতি না করা, এবং তথ্য বিনিময় ও পূর্ব সতর্কীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৪ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়, যদিও এখনও অনেক নদীতীরবর্তী দেশ এই কনভেনশন অনুমোদন করেনি। এটি আন্তঃসীমান্ত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনি দলিল হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশ গত ২৩ জুন, ২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে এই কনভেনশনে যোগ দেয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। তবে ভারত এখনও এতে সাইন করে নি।

0 comments:

Post a Comment