র্যামিফিকেশন তত্ত্ব (Ramification Theory)
ইংরেজিতে Ramification শব্দটির বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় - শাখা-প্রশাখা, ফলাফল (Consequence) ইত্যাদি। র্যামিফিকেশন থিওরিও ঠিক এভাবেই কাজ করে। ডেভিড মিটরানি (David Mitrany) ফাংশনালিজম (Functionalism) এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করার সময় সর্বপ্রথম এই তত্ত্বটি তুলে ধরেন।
এই তত্ত্বে তিনি বলেন, দুই বা ততোধিক রাষ্ট্র যদি কোনো একটি টেকনিক্যাল/অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে একসাথে কাজ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের সহযোগিতা ক্রমান্বয়ে অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়াকেই বলা হয় শাখা-প্রশাখা গজানো বা Ramification। একটি উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি আরো ক্লিয়ার হইতে পারি।
মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারত প্রথমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে একসাথে কাজ করলো।
- একসময় দেখা গেল পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন (হাইড্রোপাওয়ার) জড়িয়ে গেছে।
- বিদ্যুতের সঙ্গে আবার শিল্প উন্নয়ন ও পরিবহন ব্যবস্থা জড়িত হলো।
- পরিবহন ও শিল্প থেকে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে সহযোগিতা ছড়িয়ে গেল।
অর্থাৎ শুরুটা হয়েছিল পানি ব্যবস্থাপনা থেকে। কিন্তু ধীরে ধীরে পানি ব্যবস্থাপনার ফলস্বরূপ বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ এর ফলস্বরূপ শিল্প উন্নয়ন এবং সর্বশেষ বাণিজ্যে এর শাখা-প্রশাখা গজাতে গজাতে তারা অনেকগুলো ইস্যুতে পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে গেল। এই ধারাকেই মিটরানি Ramification বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি আরো বলেন, যদি রাষ্ট্রগুলো অনেক বিষয়ে এভাবে একসাথে কাজ করে এবং একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, তাহলে সেই সম্পর্ক ভেঙে একে-অপরের সাথে যুদ্ধ করা খুব ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই যুদ্ধের সম্ভাবনাও অনেক কমে যাবে।
স্পিলওভার ক্রিয়া (Spillover Effect)
Spillover এর একদম সহজ ভাষায় বাংলা অনুবাদ হলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে র্যামিফিকেশন আর স্পিলওভার প্রায় একই বিষয়। এই তত্ত্বের মুলবক্তব্য হলোঃ একটা বিষয়ে যখন দুই বা ততোধিক রাষ্ট্র একসাথে কাজ করে, তখন সেই কাজ করতে গিয়ে আরেকটা বিষয়ে সহযোগিতা করা জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে এই সহযোগিতা এক ক্ষেত্র থেকে আরেক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
ধরেন, কয়েকটা দেশ মিলে শুধু রেলপথ ঠিক করার জন্য সহযোগিতা শুরু করল। কিন্তু রেল ঠিক করতে গিয়ে তাদের মালামাল পরিবহন, বন্দর ব্যবহার, কাস্টমস ইত্যাদি বিষয় নিয়েও কাজ করতে হলো। এগুলো আবার টেনে আনলো অর্থনীতি, শিল্প, এমনকি রাজনীতি!
মানে, একটা ছোট জায়গায় সহযোগিতা শুরু হলে তার ঢেউ অন্য জায়গাতেও গড়িয়ে পড়ে। একেই বলে spillover effect
ইউরোপের একাঙ্গীকরণের (European integration) পিছনে এই দুইটি তত্ত্ব যেভাবে কাজ করেছে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তখন ইউরোপীয় নেতাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আবার যেন এরকম বিধ্বংসী যুদ্ধ না হয়। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থ রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক পুনর্গঠন, বিভিন্ন শিল্প ও সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়াও ছিল তাদের লক্ষ্য।
একপর্যায়ে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ একত্রে কয়লা ও ইস্পাত শিল্প (European Coal and Steel Community - ECSC) পরিচালনা করতে শুরু করল। উল্লেখ্য, কয়লা ও ইস্পাত ছিল অস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল।
ECSC সফল হওয়ার পর তারা চিন্তা করলো, শুধু কয়লা বা ইস্পাত নয়, অন্য ক্ষেত্রেও তারা একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে এবং লাভবান হতে পারে। ফলে ১৯৫৭ সালে Treaty of Rome এর মাধ্যমে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (EEC) গঠিত হয়। এর মাধ্যমে তৈরি হলো কমন মার্কেট। অর্থাৎ, পণ্যের মুক্ত প্রবাহ, শ্রমের অবাধ চলাচল শুরু হলো।
এবার যখন অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুরু হলো, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্য, পরিবহন, কৃষি, মুদ্রানীতি প্রভৃতিতে ছড়িয়ে পড়ল। অর্থনৈতিক সংহতি যত গভীর হলো, ততই রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারল রাজনীতি ও নিরাপত্তায়ও সহযোগিতা করা প্রয়োজন। এর ফলে তৈরি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (1993)
এবং তারই ধারাবাহিকতায় এলো একক মুদ্রা ইউরো (1999)।
অর্থাৎ, আমরা দেখতে পাই ইউরোপে যুদ্ধ প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে, কারণ এত বিশাল অর্থনীতি ভেঙে যুদ্ধ করা খুব ব্যয়বহুল। ঠিক যেমনটা মিটরানি তার র্যামিফিকেশন থিওরিতে বলেছিলেন। তাই আমরা বলতে পারি, ইউরোপের একাঙ্গীকরণ হলো র্যামিফিকেশন থিওরির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কয়লা-ইস্পাত দিয়ে শুরু হলেও, ধীরে ধীরে তা অর্থনীতি, রাজনীতি, মুদ্রা, নিরাপত্তা সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। যা তাদেরকে বড়সড় যুদ্ধ থেকে আজও নিয়মিত সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসুত্রঃ International Relations Theory (5th Edition) Paul R. Viotti, Mark V. Kauppi
0 comments:
Post a Comment