ব্যাংকিং/অর্থনীতি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু টার্মস


মুদ্রাস্ফীতি

মুদ্রাস্ফীতি হলো সময়ের সাথে সাথে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতার হ্রাস। সামান্য পরিমাণ (৩-৫%) মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।


মূল্যস্ফীতি

মূল্যস্ফীতি হলো সময়ের সাথে সাথে পণ্যের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রবণতা।


ব্যাংক রেট

ব্যাংক রেট হলো একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সুদের হার।


মুদ্রার অবমূল্যায়ন

মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলো আন্তর্জাতিক বাজারে একটি দেশের মুদ্রার মান বা বিনিময় হারের পতন। মুদ্রার অবমূল্যয়নের পজিটিভ এবং নেগেটিভ উভয় দিকই আছে।

পজিটিভ দিক:

  • রপ্তানি পণ্যের দাম বিদেশিদের কাছে কমে যায়, ফলে রপ্তানি বাড়ে।
  • বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি কমতে পারে।

নেগেটিভ দিক:

  • আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যায়, ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে।
  • বিদেশি ঋণের চাপ বেড়ে যায়, কারণ ঋণ শোধ করতে বেশি টাকা লাগে।

যদি অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর হয়, তাহলে কিছুটা অবমূল্যয়ন উপকারী হতে পারে; তবে অতিরিক্ত হলে তা ক্ষতিকর।


দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন এক পরিস্থিতি যেখানে দারিদ্র্যই দারিদ্র্যের কারণ হয়, অর্থাৎ একজন মানুষ বা সমাজ দারিদ্র্য থেকে বের হতে না পারার একটি চক্রে আটকে থাকে।
অনুন্নত দেশে উৎপাদন কম তাই আয়ও কম। আয় কম বলে সঞ্চয় কম, সঞ্চয় কম বলে বিনিয়োগ কম।বিনিয়োগ কম বলে মূলধনও কম। আর মূলধন না থাকায় দারিদ্র্য বাসা বাঁধে। এভাবে এটা চক্রাকারে চলতে থাকে।

CRR

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের জমাকৃত (Deposit) মোট টাকার একটি নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নগদ হিসেবে জমা রাখতে হয়। এটাকে CRR (Cash Reserve Ratio) বলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান CRR হলো (চার) ৪%

রিজার্ভ হার (CRR) বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব পড়ে?

রিজার্ভ হার (Cash Reserve Ratio বা CRR) বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতিতে সাধারণত নিম্নলিখিত প্রভাব পড়ে:

ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়: ব্যাংককে তাদের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ রিজার্ভ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। রিজার্ভ হার বাড়ালে ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণ দেয়ার জন্য কম টাকা থাকে।

ঋণের হার বৃদ্ধি পায়: ব্যাংক কম ঋণ দিতে পারার কারণে ঋণের সরবরাহ কমে যায়, ফলে ঋণের সুদের হার বাড়তে পারে।

ব্যয় ও বিনিয়োগ কমে: ঋণের ব্যয় বেশি হওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা কম ঋণ গ্রহণ করে, যার ফলে বিনিয়োগ ও খরচ কমে যায়।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: ব্যয় ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় চাহিদা কমে, যা মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করে।

সার্বিকভাবে, রিজার্ভ হার বাড়ানো অর্থনীতির ধীরগতি ঘটাতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

SLR

SLR (Statutory Liquidity Ratio) হলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট জমার (Total Deposit) একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা তাদেরকে নগদ, স্বর্ণ বা সরকার অনুমোদিত সিকিউরিটিজ আকারে নিজেদের কাছেই সংরক্ষণ করতে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত হারে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত SLR রেট বর্তমানে ১৩%। এর অর্থ হলো, বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলো তাদের মোট জমাকৃত অর্থের ১৩% নগদ, স্বর্ণ বা সরকার অনুমোদিত বন্ড আকারে নিজেদের কাছেই সংরক্ষণ করে রাখতে হবে, যাতে তারা চাইলেও সেই টাকা পুরোটা ঋণ হিসেবে দিতে না পারে।

ডাম্পিং এবং এন্টি-ডাম্পিং

যখন কোনো দেশ খুব কম দামে অন্য দেশে পণ্য রপ্তানি করে, যাতে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়, এটা ডাম্পিং (যে দেশে রপ্তানি করা হয়েছে সেই দেশে)। ডাম্পিং করা হয় মূলত দেশীয় শিল্পগুলোকে ধ্বংস ও স্থানীয় বাজার দখলের জন্য।


এন্টি-ডাম্পিং হলো ডাম্পিং ঠেকানোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে আমদানিকৃত পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হয় যাতে দেশের স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

Call Money

Call Money হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে খুব ছোট সময়ের (সাধারণত ১ থেকে ১৪ দিন) জন্য ধার হিসেবে নেওয়া বা দেওয়া টাকার লেনদেন। সাধারণত এক ব্যাংক তার প্রয়োজন মেটাতে অন্য ব্যাংক থেকে এই টাকা ধার নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত কল মানি রেট বর্তমানে ৯.৯৯%

Balance Sheet

Balance Sheet হলো কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নির্দিষ্ট সময়ের আর্থিক অবস্থার একটি প্রতিবেদন, যেখানে সম্পদ (Assets), দায় (Liabilities) এবং মূলধন (Equity) দেখানো হয়।

Fiat Money

Fiat Money হলো এমন মুদ্রা যার নিজের কোনো মূল্য নেই, কিন্তু সরকার আইন করে এর মূল্য নির্ধারণ করে এবং জনগণ তা গ্রহণে বাধ্য থাকে। যেমন টাকার নোট, যা কাগজ হলেও সরকার বলায় তার মূল্য আছে।


Balance of Trade (BOT)

দেশের রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে পার্থক্য।
  • রপ্তানি > আমদানি → Trade Surplus
  • আমদানি > রপ্তানি → Trade Deficit

Balance of Payment (BOP)

একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সব ধরনের বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব (বাণিজ্য + বিনিয়োগ + অনুদান ইত্যাদি)। এর সাথে BOT এর পার্থক্য হলোঃ
  • BOT = শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির হিসাব

  • BOP = সব আন্তর্জাতিক লেনদেনের পূর্ণ হিসাব


Letter of Credit (LC)

Letter of Credit (LC) হলো একটি ব্যাংক কর্তৃক ইস্যু করা প্রতিশ্রুতি-পত্র, যেখানে ব্যাংক বিক্রেতাকে নিশ্চিত করে যে, ক্রেতা শর্ত অনুযায়ী পণ্য গ্রহণ করলে তাকে টাকা পরিশোধ করা হবে। ধরুন, বাংলাদেশে একজন ব্যবসায়ী রফিক চায় চীন থেকে ১০০০টি মোবাইল আমদানি করতে। কিন্তু চীনের বিক্রেতা লি তো রফিককে চেনেন না। তাই তিনি আশঙ্কা করতেই পারেন, যদি পণ্য পাঠানোর পর রফিক টাকা না দেন! এই সমস্যার সমাধান করতেই এলসি ব্যবহার করা হয়। এখন রফিক ব্যাংকে গিয়ে একটি LC খুলেন। এতে পণ্যের বিবরণ, পরিমাণ, দাম (ধরুন $৫০,০০০) এবং শর্ত: যেমন, পণ্য পাঠানোর কাগজপত্র দিতে হবে, সময়মতো ডেলিভারি ইত্যাদি বিষয় লিপিবদ্ধ থাকে।

এরপর? রফিকের ব্যাংক চীনা বিক্রেতাকে বলে: "আপনি যদি LC-তে লেখা সব শর্ত ঠিকমতো পূরণ করেন, তবে আমরা আপনার টাকা পরিশোধ করব।" তখন চীনা বিক্রেতা নিশ্চিন্তে পণ্য পাঠান এবং ব্যাংকে কাগজপত্র জমা দেন। ব্যাংক যথাযথ যাচাই-বাচাই করে টাকা পরিশোধ করে।

Fiscal Policy

Fiscal Policy হলো সরকারের রাজস্ব আয় (ট্যাক্স) এবং ব্যয় (সরকারি খরচ) সংক্রান্ত নীতি, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস করতে ব্যবহার করা হয়। সহজভাবে বললে, সরকার কত টাকা আয় করবে (ট্যাক্স তুলে) আর কোথায় খরচ করবে (যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো), এই পুরো পরিকল্পনাই Fiscal Policy।

ট্যাক্স

ট্যাক্স মূলত দুই প্রকারের হয়: প্রত্যক্ষ কর এবং পরোক্ষ কর।

প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax) হলো এমন কর যা সরাসরি সেই ব্যক্তিকে দিতে হয় যিনি আইনগতভাবে কর প্রদানে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, ইনকাম ট্যাক্স।

অপরদিকে, পরোক্ষ কর (Indirect Tax) হলো এমন কর যা প্রথমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত হলেও, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান করের বোঝা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অন্য কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। যেমন, ভ্যাট।


ফিসক্যাল পলিসি, মনিটারি পলিসি, রাজস্বনীতি

ফিসক্যাল পলিসি (Fiscal Policy)

সরকারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার নীতি। এর মাধ্যমে সরকার কর (ট্যাক্স) সংগ্রহ এবং ব্যয় বৃদ্ধি বা কমিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। উদাহরণ: কর বাড়ানো বা কমানো, সরকারী খরচ বাড়ানো বা কমানো।

মনিটারি পলিসি (Monetary Policy):

দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (যেমন বাংলাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক) কর্তৃক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করার নীতি। উদাহরণ: সুদের হার পরিবর্তন, রিজার্ভ হার বাড়ানো বা কমানো।

রাজস্বনীতি (Revenue Policy):

সরকারের আয়ের উৎস, বিশেষ করে কর ও অন্যান্য রাজস্ব সংগ্রহের নীতি। রাজস্বনীতি মূলত সরকারের আয়ের উৎস নির্ধারণ ও সংগ্রহের পরিকল্পনা। উদাহরণ: করের হার নির্ধারণ, নতুন কর আরোপ, কর রিফান্ড নীতি।

সহজ কথায়, ফিসক্যাল পলিসি সরকারের আয় ও ব্যয় নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে মনিটারি পলিসি দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে। মুদ্রানীতির (মনিটারি পলিসি) মতো আরেকটি নীতি হলো রাজস্বনীতি। একটি দেশের সরকারের আয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার কলাকৌশলকে রাজস্বনীতি বলা হয়।


ফিন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স

ফিন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (FATF) হলো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেটি মুলত অর্থপাচার (money laundering), সন্ত্রাসবাদী অর্থায়ন (terrorist financing) এবং অন্যান্য আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত। এটি ৩৪টি উন্নত দেশ ও দুটি আঞ্চলিক সংস্থা নিয়ে গঠিত।

Standing Deposit Facility (SDF)/Reverse Repo

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত অর্থ/এসেট স্বল্পমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রেখে সুদ নেয়। একে SDF বলে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে টাকা তুলে নেওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করে। আগে এটাকে Reverse Repo Rate বলা হতো। বর্তমানে SDF রেট হলো ৮%

Standing Lending/Liquidity Facility (SLF)

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে (Liquidity Crisis) পড়লে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদে ঋণ নেয়। এটাকে SLF বলে। এটাকে Special Repo Rate ও বলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংককে ওভারনাইট ঋণ দিতে এটা ব্যবহার করে। বর্তমানে SLF রেট ১১.৫০%

রিপো রেট

রিপো রেট (Repo Rate) হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্বল্পমেয়াদি ঋণের বিনিময়ে নির্ধারিত সুদের হার। এটাকে পলিসি রেটও বলা হয়ে থাকে। সহজ ভাষায়, যখন ব্যাংকগুলোকে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের দরকার পড়ে, তখন তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয় এবং সেই ঋণের জন্য যে সুদ দিতে হয়, সেটাই রিপো রেট।  রিপোরেট বাড়ানোর মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত রিপো রেট 10.00%। ব্যাংক রেটও প্রায় একই। তবে পার্থক্য হলো ব্যাংক রেট হলো দীর্ঘমেয়াদি, অন্যদিকে রিপোরেট হলো স্বল্পসময়ের জন্য। ব্যাংক রেট বর্তমানে 4%







0 comments:

Post a Comment