অর্থনীতির Impossible Trinity


আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Impossible Trinity, যাকে অনেক সময় Unholy Trinity নামেও ডাকা হয়। নামটা শুনতে একটু জটিল লাগলেও এর ধারণাটি খুবই সহজ এবং অর্থনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত।

ধরুন, আপনি একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। আপনার সামনে তিনটি লক্ষ্য আছে, যেগুলো একসঙ্গে অর্জন করতে পারলে অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তিনটির মধ্যে আপনি একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুইটি বেছে নিতে পারবেন। তিনটি একসঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতাকেই বলা হয় Impossible Trinity।

এরমধ্যে প্রথম লক্ষ্য হলো ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট (Fixed Exchange Rate)। এর অর্থ, আপনি আপনার দেশের মুদ্রার মান একটি নির্দিষ্ট হারে ধরে রাখবেন। যেমন ধরুন, আপনি ঠিক করলেন ১ ডলার সবসময় ১২০ টাকার সমান থাকবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আসে। আমদানি ও রপ্তানিকারকরা আগে থেকেই জানেন তারা কত দামে লেনদেন করবেন, ফলে তাদের অনিশ্চয়তা কমে যায়।

দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো (Free Capital Flow)। এর মানে, দেশের ভেতরে এবং বাইরে টাকা অবাধে যাতায়াত করতে পারবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজেই আপনার দেশে বিনিয়োগ করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে তাদের টাকা বের করেও নিতে পারবে। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগোতে পারে।

তৃতীয় লক্ষ্য হলো স্বাধীন মুদ্রানীতি (Independent Monetary Policy)। এর মাধ্যমে আপনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদের হার বাড়াতে বা কমাতে পারবেন। যদি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, আপনি সুদের হার বাড়িয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আবার অর্থনীতি ধীরগতির হলে সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই তিনটি একসঙ্গে রাখা কেন সম্ভব নয়?

ধরুন, আপনি ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট রাখতে চান এবং একই সঙ্গে ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো চালু রাখলেন। এর পাশাপাশি আপনি নিজের মতো করে সুদের হারও নির্ধারণ করতে চাইলেন। এই অবস্থায় যদি আপনি সুদের হার কমিয়ে দেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার খোঁজে অন্য দেশে চলে যাবে। ফলে আপনার দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের হয়ে যাবে।

এইযে টাকাগুলো বেরিয়ে গেল, এই কারণে আপনার মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হবে এবং এর মান কমতে শুরু করবে। কিন্তু আপনি তো আগে থেকেই এক্সচেঞ্জ রেট ফিক্সড করে রেখেছেন। তাই সেটিকে ধরে রাখতে হলে আপনাকে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এই হস্তক্ষেপ করতে করতে একসময় আপনি দেখবেন যে, আপনার মুদ্রানীতি আর স্বাধীনভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ, আপনি তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে ধরে রাখতে পারলেন না।

এই কারণেই পৃথিবীতে যেকোনো দেশ সাধারণত তিনটির মধ্যে যেকোনো দুইটিকে বেছে নেয়।

উদাহরণ হিসেবে United States এর কথা ধরা যাক। তারা ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো এবং স্বাধীন মুদ্রানীতি বজায় রাখে, কিন্তু তাদের এক্সচেঞ্জ রেট ফিক্সড নয়। ডলারের মান বাজারের উপর নির্ভর করে ওঠানামা করে।

অন্যদিকে China দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট এবং নিজস্ব মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে, তবে তারা পুরোপুরি ফ্রি ক্যাপিটাল ফ্লো অনুমোদন করে না।

0 comments:

Post a Comment