সহজ ভাষায় ব্যাকডোর এবং ব্যাকচ্যানেল কূটনীতির পার্থক্য


ব্যাকডোর (Backdoor Diplomacy)

ধরুন, দেশের ভেতরে এমন একটি সংঘাতপূর্ণ বা সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার সমাধানে অন্য কোনো দেশের সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু এই বিষয়টি যদি জনগণ বা মিডিয়ার সামনে ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হতে পারে। এমন অবস্থায় সরকার গোপনে অফিশিয়ালি সেই দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসে।

উদাহরণস্বরূপ:

রাস্তায় অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমি যদি দরজা খুলে বের হই, সবাই দেখতে পাবে আমি কোথায় যাচ্ছি। তাই আমি সামনে না গিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা (ব্যাকডোর) দিয়ে গোপনে বের হয়ে, অন্য দেশের সাথে আলোচনা করি।

এই কৌশলকে বলা হয় ব্যাকডোর কূটনীতি, অর্থাৎ জনগণ বা মিডিয়ার সামনে না গিয়ে, নীরবে রাষ্ট্রীয় স্তরে যোগাযোগ স্থাপন করা।

বাস্তব প্রয়োগঃ

ইসরায়েল-আরব শান্তি আলোচনা (অসলো অ্যাকর্ডস - ১৯৯৩): ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন লম্বা সময় ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। তখন দু’দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গোপনে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে একটি ছোট্ট বাড়িতে দুই পক্ষের প্রতিনিধি দল অনানুষ্ঠানিকভাবে গোপনে আলোচনায় বসে।


ব্যাকচ্যানেল (Backchannel Diplomacy)

এই ক্ষেত্রেও ধরেন, দেশ সংকটে রয়েছে এবং অন্য দেশের সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই সংবেদনশীল যে, সরকার সরাসরি যোগাযোগ করলেও ঝুঁকি থাকতে পারে। অর্থাৎ, ব্যাকডোর ব্যবহার করাও নিরাপদ নয়।

তখন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয় ব্যাকচ্যানেল, অর্থাৎ তৃতীয় পক্ষ বা নন-স্টেট অ্যাক্টর এর মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন।

উদাহরণস্বরূপ:

বাংলাদেশের একটি সংকটে পাকিস্তানের সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরাসরি পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। তবে পাকিস্তানের সাথে চীনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ তখন চীনের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছে বার্তা পাঠায়। এই চ্যানেলটি হয় গোপন এবং আন-অফিশিয়াল, এবং এতে কেউ জানে না কে কার সাথে কথা বলছে।

উল্লেখ্য, এখানে তৃতীয় পক্ষ হতে পারে:

  • অন্য কোনো রাষ্ট্র (যেমন: চীন),

  • কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি বা বিশেষ দূত,

  • এমনকি নিজের দেশের নন-স্টেট অ্যাক্টর (যেমন: সাবেক রাষ্ট্রদূত, গবেষক, এনজিও প্রতিনিধি)।

বাস্তব প্রয়োগঃ

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক স্থাপন (নিক্সন যুগ - ১৯৭১): ১৯৭০-এর দশকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। সেই সময়ে প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইলেও সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব ছিল না, কারণ চীন ছিল কমিউনিস্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্র বলে গণ্য। তখন নিক্সন একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি হেনরি কিসিঞ্জার-কে গোপনে পাকিস্তানের মাধ্যমে চীনে পাঠান। কিসিঞ্জারের এই সফর ছিল সম্পূর্ণ গোপনীয় এবং আন-অফিশিয়াল। এই গোপন আলোচনা থেকেই ১৯৭২ সালে নিক্সনের চীন সফর এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়।

0 comments:

Post a Comment