ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণ, ঘটনাপ্রবাহ ও বৈশ্বিক প্রভাব

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের মূল প্রেক্ষাপট ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যে তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব। ইসরায়েল দাবি করে, ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে অগ্রসর হচ্ছিল এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ ইসরায়েলবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিচ্ছিল। এই আশঙ্কা থেকে ইসরায়েল ১৩ জুন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক হামলা চালায়। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে, ফলে সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। মূলত পারমাণবিক হুমকি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাই এ যুদ্ধের প্রধান কারণ।

Iran-Israel Map (Source: https://www.cato.org/)

গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন

Operation Rising Lion: ১৩ জুন ২০২৫-এ Iran-এর বিরুদ্ধে Israel এই অপারেশন চালায়, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় মিলিটারি কমান্ড ধ্বংস করা। এই অভিযানে ইরানের ৩০ জন উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা ও ১১ জন পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হয়। এছাড়া ইরানের কিছু মিসাইল লঞ্চার এবং এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Operation True Promise III: ইরানের Islamic Revolution Guards Corps (IRGC) ১৩ জুন ইসরায়েলের হামলার পর থেকে Israel-এর বিরুদ্ধে লাগাতার ২০০+ মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়। এ অভিযানে ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে তেল আবিব, ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এইসময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বাঙ্কারে অবস্থান নেন।

Operation Midnight Hammer২২ জুন ২০২৫ রাতে United States ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় (Fordow Fuel Enrichment Plant, Natanz Enrichment Facility ও Isfahan Conversion Facility) হামলা চালায়। এই অভিযানে ব্যবহার করা হয় বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ও সাবমেরিন থেকে লঞ্চ করা ক্রুজ মিসাইল। এই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেন। তবে ইরানের প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি এটাকে "Daydream" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

Operation Herald of Victoryমিডনাইট হ্যামারের জবাবে ইরান ২৩ জুন ২০২৫ কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি Al‑Udeid Air Base এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিতে কেউ হামলা করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। তবে ট্রাম্প বলেন হামলার আগেই ইরান সতর্ক করেছিল।

বাংলাদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের উপর প্রভাব

ইরান-ইসরায়েলের এই ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়।

Hormuj Strait

বাংলাদেশের জন্য

  • বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে জ্বালানি ও এলএনজি (LNG) আমদানিতে নির্ভরশীল। এই যুদ্ধ জ্বালানি খাতে ঝুঁকি তৈরি করেছে।

  • রপ্তানি খাত (বিশেষ করে আরএমজি) ও শিপিং রুটে বিঘ্ন ঘটতে পারে, ফলশ্রুতিতে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়েছে

  • সরকারের জন্য বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বৃদ্ধি।

সমগ্র বিশ্বের জন্য

  • মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির রুট (যেমন Strait of Hormuz) উত্তেজনার কারণে বন্ধ হয়ে গেলে তেল ও গ্যাসের দাম হুরহুর করে বাড়তে পারে।

  • শিপিং রুট ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্য, কাঁচামাল ও উৎপাদন খাতে।

  • অর্থনৈতিক বাজারগুলোতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, স্টক মার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

  • রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।


বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার এর প্রতিক্রিয়া

নিচে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশ কী ভূমিকা নিয়েছে তা সংক্ষেপে দেওয়া হলো।

জাতিসংঘ (UN):

  • এই দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষ দ্রুত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যীয় বা বৈশ্বিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
  • যুদ্ধবিরতির আহ্বান করেছে ও কূটনৈতিক রুটে আলোচনা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছে।
  • International Atomic Energy Agency (IAEA)-র তথ্য ভিত্তিতে ইরান ও ইস্রায়েল উভয়ের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে মনোনিবেশ করেছে।

International Atomic Energy Agency (IAEA):

  • ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে বলে জানায়।
  • ইরান-ইস্রায়েল সংঘর্ষের পর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার পর প্রযুক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
  • ইরানের সঙ্গে পুনরায় সহযোগিতা ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম শুরু করার প্রয়োজনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরান (Iran):

  • বলেছে তারা তাদের সার্বভৌমত্ব ও পারমাণবিক অধিকারের রক্ষার্থে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেবে।
  • যুদ্ধবিরতির আলোচনায় যাওয়ার আগেই উল্লেখ করেছে তারা আগে প্রতিশোধ নিবে, তারপর আলোচনা করবে।
  • IAEA-র সঙ্গে সহযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। 

ইস্রায়েল (Israel):

  • বলেছে তারা ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক হুমকিকে তাদের নিজেদের (ইসরায়েলের) নিরাপত্তার স্বার্থে হস্তক্ষেপ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র (United States)

  • মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা গেছে।
  • পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত মনিটরিং করছে।

দীর্ঘস্থায়ী শান্তি রক্ষায় করনীয়

নিচে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হলো যেগুলি দীর্ঘ মেয়াদে প্রয়োগযোগ্য হতে পারে:

  1. মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানোঃ বিশ্ব সাধারণ ও অঞ্চলীয় শক্তিগুলো (যেমন China, Russia, United Nations) সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, যাতে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংলাপ হয়।

  2. হিউম্যানিটেরিয়ান কার্যক্রমঃ বিশ্বের শরণার্থী ও জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিয়ে হিউম্যানিটেরিয়ান কার্যক্রম চালানো।

  3. UN (জাতিসংঘ): আঞ্চলিক শান্তি পর্যবেক্ষণ মিশন ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ জোরদার করে পুনরায় সংঘর্ষের সূত্রপাত রোধ করা।

  4. US (যুক্তরাষ্ট্র): উভয় পক্ষের সঙ্গে সংলাপ বজায় রেখে সামরিক সহায়তার বদলে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে মনোযোগী হওয়া।

  5. IAEA (আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা): ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শন আরও কড়াকড়ি করা।

  6. EU (ইউরোপীয় ইউনিয়ন): ইরান-ইস্রায়েল উভয় দেশের জন্য নিরাপত্তা-সংলাপ ফোরাম তৈরি করে অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো।

  7. আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহ (যেমন কাতার, ওমান): মধ্যস্থতার জন্য স্থায়ী “গালফ পিস ইনিশিয়েটিভ” বা শান্তি-চ্যানেল গঠন করা।

  8. মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি: অনলাইনে ও বিভিন্ন মিডিয়ায় উসকানিমূলক প্রচারণা ঠেকাতে তথ্য-যাচাই ও শান্তি-কূটনীতি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো।


JCPOA ও ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের সূক্ষ্ম সম্পর্ক

ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন নয়; কিন্তু এই সংঘাতের আধুনিক রূপের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো JCPOA, অর্থাৎ Joint Comprehensive Plan of Action যা ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি - P5+1) মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি।

এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল, ইরান যেন তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে। এতে ইরান নির্দিষ্ট পরিমাণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমা আরোপে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন অনুমোদনে এবং কিছু পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ রাখতে রাজি হয়েছিল।

তবে ইসরায়েল এই চুক্তিকে প্রথম থেকেই “বিপজ্জনক” হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসরায়েলের যুক্তি ছিল -

JCPOA ইরানকে সাময়িকভাবে থামাবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখবে না।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে JCPOA থেকে সরে যান, এবং ইরানের উপর পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এরপর থেকে ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করতে শুরু করে। যেমন:

  • ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বৃদ্ধি,

  • নতুন সেন্ট্রিফিউজ চালু করা,

  • IAEA (International Atomic Energy Agency)-এর পরিদর্শন সীমিত করা।

একারণে ইসরায়েলের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়, কারণ তারা মনে করে ইরান এখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি

ফলে, ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েল কয়েক দফায় গোপন অপারেশন, সাইবার হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক বোমা হামলা চালায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর। ইরানও এর জবাবে ইসরায়েলে দফায় দফায় আঘাত হানে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের (যেমন হিজবুল্লাহ, হামাস) মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়।

এইভাবে JCPOA ভাঙনের পর থেকেই ইরান-ইসরায়েল সংঘাত কেবল রাজনৈতিক বা গোয়েন্দা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়।

0 comments:

Post a Comment