রাষ্ট্রের অপরিহার্য ও ঐচ্ছিক কার্যাবলি

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র প্রধানত দুই ধরণের ভূমিকা পালন করে, যথাঃ নিয়ন্ত্রণ ও কল্যাণমূলক। এই দুইধরনের ভূমিকার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্রের কার্যাবলিকে দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা (ক) অপরিহার্য বা মুখ্য কার্যাবলি (খ) কল্যাণমূলক বা ঐচ্ছিক কার্যাবলি। 


অপরিহার্য বা মুখ্য কার্যাবলিঃ

আর. এম. ম্যাকাইভার তাঁর The Modern State গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এই লক্ষ্যে রাষ্ট্র কিছু অপরিহার্য বা মুখ্য কার্যাবলি সম্পাদন করে। এসব কার্যাবলি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও জনগণের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  1. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা
    • নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি ও স্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
    • সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
    • আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তি প্রদান ও অপরাধ দমন করা।
    • এ জন্য রাষ্ট্র পুলিশ, আনসার, গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ইত্যাদি বাহিনী গঠন করে।
  2. জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা
    • দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা।
    • বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
    • স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী পরিচালনা করা।
    • প্রতিরক্ষা বাহিনী আধুনিকায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
  3. পররাষ্ট্র বিষয়ক কার্যাবলি সম্পাদন করা
    • আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রকে পরিচিত করা।
    • অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও চুক্তি সম্পাদন করা।
    • বিদেশে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করা।
    • বৈদেশিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক বাজার সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ করা।
  4. আইন প্রণয়ন ও বিচার ব্যবস্থা গঠন
    • আইনসভা বা পার্লামেন্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়ন করা।
    • আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
    • সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট ও অন্যান্য বিচারালয়ের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করা।
  5. প্রশাসনিক কাঠামো গঠন ও পরিচালনা করা
    • রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
    • কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ, কাজের বণ্টন ও তদারকি করা।
    • প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করা।
  6. অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা
    • রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টন করা।
    • কর ও খাজনা নির্ধারণ ও আদায় করা।
    • বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রা প্রবর্তন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
    • মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা।


কল্যাণমূলক বা ঐচ্ছিক কার্যাবলিঃ

  1. শিক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি
    • রাষ্ট্রের জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা।
  2. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংস্কার
    • জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান।
    • বিদ্যমান বিভিন্ন বৈষম্য ও কুপ্রথা দূরীকরণ।
  3. খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ
    • চাল, ডাল, আটা, ময়দা ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ প্রক্রিয়া সচল রাখা।
  4. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ
    • ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো।
    • উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টি ও রপ্তানিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা।
  5. অবকাঠামোগত উন্নয়ন
    • রাস্তাঘাট, সেতু, সড়ক, রেলপথ, নৌ-চলাচল ও বিমান যোগাযোগের ব্যবস্থা করা।
    • ডাক ও টেলিযোগাযোগের উন্নয়ন সাধন করা।
  6. জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা
    • জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করা।
  7. স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করা
    • জনগণের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা।
  8. সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান
    • বেকারদের জন্য ভাতা, বয়স্কদের জন্য বয়স্কভাতা, পেনশন ইত্যাদি প্রদান করা।
  9. রাষ্ট্রীয় কর্মীবাহিনী পরিচালনা
    • রাষ্ট্রের বিশাল কর্মীবাহিনী পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা।
  10. শ্রমিক কল্যাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
    • শ্রমনীতিমালা প্রণয়ন করা।
    • ন্যূনতম মজুরি ও কাজের সময় নির্ধারণ করা।
    • কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, বোনাস, ইন্সুরেন্স ও পেনশন সুবিধা প্রদান।
    • কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা।
    • বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কর্মকর্তা নিয়োগ করা।
  11. কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন
    • কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
  12. পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
    • বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা।
    • প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা ও ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য ও পুনর্বাসন করা।
  13. দুর্ভিক্ষ ও মহামারি প্রতিরোধ
    • নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন।
  14. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা উন্নয়ন
    • বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  15. প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা
    • প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ করা।
  16. নগরায়ণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন
    • শহর ও গ্রামের সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
  17. কালোবাজারি ও ভেজাল প্রতিরোধ
    • কালোবাজারি রোধ করা।
    • খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  18. নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষা
    • নারী ও শিশু পাচার রোধ করা।
    • নারী ও শিশুদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য

  1. রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা
  2. রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা
  3. রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান মেনে চলা এবং আইনের প্রতি সম্মান দেখানো
  4. সততা ও বিবেচনার সাথে ভোট প্রদান করা
  5. অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে ভোট না দেওয়া
  6. যথাসময়ে কর ও খাজনা প্রদান করা
  7. রাষ্ট্র কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালন করা
  8. কর্মক্ষেত্রে একাগ্রতা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা
  9. সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন, টিকা গ্রহণ করানো ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা
  10. দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং দেশের উন্নয়নে সচেষ্ট থাকা
  11. জাতীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস, বীর ও মনীষীদের সম্মান করা
  12. ভিন্নমত, সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি সহিষ্ণু থাকা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা
  13. দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো (আইন নিজের হাতে না তুলে)
  14. সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা

তথ্যসুত্রঃ NCTB প্রণিত ২০২৫ সালের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই।

0 comments:

Post a Comment