LDC বা Least Developed Countries হলো জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এমন সব দেশ যারা উন্নয়নশীল হলেও অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে পিছিয়ে আছে। ১৯৬০ এর দশকে UN Research Institute ও Development Planning Committee তাদের গবেষণায় দেখায় যে, সব উন্নয়নশীল দেশ সমান নয়, কিছু দেশকে উন্নয়নের জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে হয়। অর্থাৎ, One-size-fits-all Development Model এইসব দেশের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। যেমন IMF বা World Bank এর Structural Adjustment Policy - SAP এর কথা ধরা যাক। IMF বলে মার্কেটকে ফ্রি করে দিতে, কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ Free Market পদ্ধতিতে Infant Industry Argument তৈরি হয়। দেশীয় শিল্প তখন সমৃদ্ধ বা মাথা তুলে দাড়াতে পারে না। তাই এই সকল দেশে One-size-fits-all Development Model কাজ করে না। তারপর ১৯৭০ সালে জাতিসংঘের Economic and Social Council - ECOSOC এর অধীন Committee for Development Policy - CDP তিনটি সূচকের ভিত্তিতে মোট ২৫টি দেশকে (বর্তমানে ৪৪টি) LDC হিসেবে ঘোষণা করে এবং তাদের জন্য Special Assistance এর ব্যবস্থা (Provision) করে। এই তিনটি সূচক হলো:
১। অর্থনৈতিক দুর্বলতা (Economic Vulnerability)
- মাথাপিছু আয় অতি কম
- উৎপাদনশীলতা কম/নেই
- শিল্প ও প্রযুক্তি দুর্বল
- রপ্তানির বৈচিত্র নেই বললেই চলে
- স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষা সূচক অত্যন্ত দুর্বল
- দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির পরিবেশ নেই
- জলবায়ু ঝুঁকি
- সাইক্লোন/বন্যা
- ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকট
- ল্যান্ডলক রাষ্ট্রের বাজার সীমাবদ্ধতা
LDC'র ৫টি প্রধান সুবিধা
LDC উত্তরণের জন্য শর্তাবলী এবং বাংলাদেশের অবস্থান
| সূচক (Criteria) | থ্রেশহোল্ড | বাংলাদেশের অবস্থান, ২০১৮ | বাংলাদেশের অবস্থান, ২০২১ | বাংলাদেশের অবস্থান, ২০২৪ |
|---|---|---|---|---|
| GNI per capita (US$) | ≥ 1306 | 1274 | 1827 | 2684 |
| Human Assets Index (HAI) | ≥ 66 | 73.2 | 75.3 | 77.5 |
| Economic & Environmental Vulnerability Index (EVI) | ≤ 32 | 25.2 | 27.3 | 21.9 |
[Source: UN Dept of Economic & Social Affairs]
বাংলাদেশ সর্বপ্রথম ১৯৭৩ সালে এলডিসিভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করে এবং বিভিন্ন দরকষাকষির পরে ১৯৭৫ সালে এলডিসির অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রতিফলন হলেও সামনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী সংগঠনের একটি অংশ উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছে, অন্যদিকে আরেক অংশ মনে করেন নির্ধারিত সময়েই উত্তরণ বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
এলডিসি (LDC) উত্তরণের পক্ষে যুক্তি
৬। উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ: সময়মতো উত্তরণ করলে বাংলাদেশকে দ্রুত অর্থনীতি, শিল্পনীতি, প্রযুক্তি ও দক্ষতায় উন্নত হতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে।
৭। বিশ্ববাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি: এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে। বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশ আরও স্থিতিশীল ও সক্ষম হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
৮। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা: উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা বেশি আগ্রহ দেখাতে পারেন, কারণ এটি অর্থনৈতিক শক্তি ও স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে।
৯। ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি: উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে বেশি ঋণ দিতে আগ্রহী হবে।
১০। দ্রুত প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ: যেসব দেশ আগে গ্র্যাজুয়েট করেছে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। বাংলাদেশ দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে একই পথে এগোতে পারে।
এলডিসি (LDC) উত্তরণের বিপক্ষে যুক্তি
শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো: উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে রপ্তানি 6 থেকে 14 শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা আছে।
ওষুধ শিল্পের Patent সুবিধা হারানো: TRIPS ছাড় উঠে গেলে অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে ক্যান্সারের ওষুধ ইমাটিনিবের দাম কয়েক হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে যাওয়া: তৈরি পোশাক শিল্পে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে বড় চাপে পড়তে পারে।
ভর্তুকি প্রদান ও বিশেষ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়া: WTO এর অধীনে রপ্তানিতে ভর্তুকিসহ বিশেষ সুবিধা বন্ধ হবে, যা শিল্পখাতকে প্রভাবিত করবে।
অর্থনৈতিক প্রস্তুতির ঘাটতি: ব্যবসায়ীরা মনে করেন বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো যথেষ্ট নয়। অর্থনীতি ভয়াবহ বিশ্ব প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে এবং প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ সুদ প্রদান: সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে এবং বাজারভিত্তিক উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে।
দেশীয় শিল্পের দুর্বলতা প্রকাশ হওয়ার আশংকা: উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখনো পর্যাপ্ত নয় বলে উত্তরণের পরে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
এলডিসি উত্তরণে করণীয়
- শিল্পখাতে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অটোমেশন বাড়ানো
- শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করা
- কাঁচামাল ও উপাদান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া
- নতুন বাজার খোঁজা এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণ
- উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্য (value-added products) তৈরি করা
- আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে সহায়ক নীতি প্রণয়ন
- নতুন বাণিজ্য চুক্তি যেমন FTA, PTA ইত্যাদি করতে হবে
- ভর্তুকি বন্ধের প্রেক্ষিতে নতুন নীতি সহায়তা তৈরি করা
- রপ্তানি খাতবান্ধব করনীতি, শুল্কনীতি ও ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা
- দ্রুত অনুমোদন (one-stop service) ব্যবস্থা কার্যকর করা
- ওষুধ শিল্পের জন্য গবেষণা, উদ্ভাবন ও পেটেন্ট-সম্পর্কিত সক্ষমতা বাড়ানো
- শুল্কমুক্ত সুবিধার পরিবর্তে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া
- বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি
- ইজ অব ডুয়িং বিজনেস (Ease of Doing Business) উন্নয়ন
- বাজারভিত্তিক ঋণের চাপ মোকাবিলায় আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা
- Smooth Transition Strategy (STS) এর অধীনে সুস্পষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি
- বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ব্যবসায়ী সংগঠন ও উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ
- বার্ষিক অগ্রগতি মূল্যায়ন ও দ্রুত সংশোধন
- প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি
- শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি
- কর্মী পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ
- আইটি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা প্রকৌশলসহ (Light Engineering) নতুন সম্ভাবনাময় খাত উন্নয়ন
- রপ্তানি নির্ভরতা পোশাকের বাইরে প্রসারিত করা
- নীতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
- সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন ও দক্ষতা বৃদ্ধি
- যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি পরিবর্তনসহ বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবণতা পর্যবেক্ষণ
- দেশি শিল্পকে নতুন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় অভিযোজিত করা

0 comments:
Post a Comment