Post-Structuralism (উত্তর কাঠামোবাদ)
Post-Structuralism বা উত্তর কাঠামোবাদ বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রথমে Structuralism বা কাঠামোবাদ বুঝতে হবে। কারণ Post-Structuralism মূলত Classical Structuralism কে চ্যালেঞ্জ বা ক্রিটিক করে।
বিংশ শতকের শুরুতে ভাষাবিদ Ferdinand de Saussure একটা সুন্দর তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, ভাষার একটা সুনির্দিষ্ট কাঠামো আছে। যেমন ধরেন, বিড়াল বললে আমাদের মননে মগজে একটাই প্রাণী ভেসে উঠে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কাঠামোটা ঠিক থাকলে অর্থও ঠিক থাকে। অর্থাৎ তিনি বলতে চাচ্ছেন যে, আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজ বা সংস্কৃতি ইত্যাদি একটা নির্দিষ্ট কাঠামোকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। এটাই Structuralism বা কাঠামোবাদের মূল বক্তব্য।
কিন্তু কিন্তু কিন্তু, ষাটের দশকের শেষে ফ্রান্সের Foucault, Derrida, Lacan সহ আরো কিছু দার্শনিক উঠে বললেন, এই কাঠামোটা নির্দিষ্ট নয়। বরং তারা দেখান যে, শব্দের অর্থ পুরোপুরি নির্দিষ্ট না। প্রতিটি শব্দ কনটেক্সট, তার আগের বা পরের শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন ধরেন, Freedom এর মানে একেক জনের কাছে একেক রকম। একজন প্রান্তিক কৃষকের কাছে এক রকম, একজন রাজনীতিবিদের কাছে আরেক রকম, একজন নারীর কাছে সম্পূর্ণ আলাদা। তাহলে প্রশ্ন উঠে, আসলে কোনটা সঠিক? এখানেই Post-Structuralism বলে, কোনোটাই চূড়ান্ত না। বরং এটি আপেক্ষিক। এটি নির্ভর করে কে বলছে, কখন বলছে, কার ক্ষমতা বেশি ইত্যাদি বিষয়ের উপর।
Deconstructionism (বিনির্মাণবাদ)
Deconstructionism এর সাথে Post-Structuralism এর অত্যন্ত সুক্ষ্ম সম্পর্ক রয়েছে। Post-Structuralism যখন বলল, অর্থ আপেক্ষিক, কাঠামো অনির্দিষ্ট, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন উঠল। ঠিক আছে, কাঠামো অনির্দিষ্ট তো বুঝলাম, কিন্তু সেটা কীভাবে প্রমাণ করবো? শুধু বললেই তো হবে না, দেখাতেও তো হবে।
এই দেখানোর কাজটাই করলেন ফরাসি দার্শনিক Jacques Derrida। তিনি এর নাম দিলেন Deconstruction, বাংলায় যাকে বলা যায় বিনির্মাণ। এর মানে হলো, কোনো কিছু ভেঙে তার ভেতরটা দেখা।
Derrida লক্ষ করলেন, মানুষ সবকিছু চিন্তা করে জোড়ায় জোড়ায়। এই জোড়াগুলোকে বলা হয় Binary Opposition. যেমন ভালো / মন্দ, পুরুষ / নারী, সভ্য / অসভ্য, বুদ্ধি / আবেগ ইত্যাদি।
দেখতে খুবই সাধারণ লাগছে, তাই না? কিন্তু Derrida বললেন, এই জোড়াগুলোতে সবসময় একটাকে উপরে, অন্যটাকে নিচে দেখানো হয়। যেমন, বুদ্ধিকে আমরা আবেগের চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করি, সভ্যকে অসভ্যের চেয়ে বেশি উন্নত মনে করি। কিন্তু এই মানদণ্ড কে ঠিক করেছিল? কখন? কার সুবিধার জন্য?
অর্থাৎ, Deconstruction কোনো কিছুকে ধ্বংস করতে বলে না। বরং যেটাকে স্বাভাবিক বা চিরন্তন সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছে, সেটার ভিতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করে, এই সত্যটা আসলে কে তৈরি করেছিল?
এবার একটু বাস্তব উদাহরণে আসি। আপনি যদি ইতিহাসের বই খোলেন, দেখবেন ব্রিটিশরা ভারতে এসেছিল সভ্যতার বুলি নিয়ে। তারা রেলপথ বানিয়েছে, আইন এনেছে, শিক্ষা দিয়েছে। Deconstruction এই বয়ানটাকে নিয়ে প্রশ্ন করে, এই সভ্যতা মানে আসলে কার সংস্কৃতি? যে কৃষককে নীলচাষে বাধ্য করা হয়েছিল সে কৃষক কি বলত ব্রিটিশরা সভ্যতা এনেছে? যে নবাব তাঁর নবাবী হারিয়েছিলেন, তাঁর বয়ানটা তাদের ইতিহাসের বইয়ে কোথায়? তাহলে ইতিহাস কি কেবলই বিজয়ীদের সাজানো গল্প?
এখানেই Deconstruction এর কথা হলো, যে গল্পটা গেলানো হচ্ছে, তার ভিতরে তাকাতে হবে। তাহলে অধিকাংশ সময় দেখা যাবে, যে গল্পটা বলা হয়নি সেটাই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে একটু থামা দরকার, কারণ অনেকেই এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলেন।
Post-Structuralism হলো একটা দার্শনিক ধারা। যার মূল কথা হলো অর্থ, সংস্কৃতি, বয়ান ইত্যাদি আপেক্ষিক।
অন্যদিকে, Deconstruction হলো সেই দার্শনিক ধারার একটি নির্দিষ্ট দিক, যার মূল কাজ হলো যেকোনো ধারণা বা বয়ানের ভেতরে ঢুকে দেখানো যে তার মধ্যে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে।
এই দুটো তত্ত্ব একসাথে আমাদের একটাই কথা বলে, যা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, তার দিকে একটু ভুরু কুঁচকে তাকাতে হবে। যে কথাটাকে সবাই সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছে, যে কাঠামোটা সার্বজনিন বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটার ভেতরে হয়তো একটা পুরনো ক্ষমতার গল্প লুকিয়ে আছে। কারো গলার স্বর চাপা দেওয়া আছে।
সবশেষে, এই তত্ত্বগুলো পড়ে অনেকে ভাবেন, তাহলে কি কোনো সত্যই নেই? সব মনগড়া? এই প্রশ্নটা স্বাভাবিক, কিন্তু উত্তরটা একটু সহজ। Post-Structuralism বলে না যে সত্য বলে কিছু নেই। বলে যে সত্যকে সবসময় প্রশ্ন করতে হবে। কে বলছে? কোন প্রেক্ষাপটে? কার স্বার্থে? গল্পের কোন দিকটা বলা হচ্ছে না?
0 comments:
Post a Comment