DNA ফিঙ্গারপ্রিন্টিং এর কর্মপদ্ধতি

DNA ফিঙ্গারপ্রিন্টিং, যাকে জেনেটিক ফিঙ্গারপ্রিন্টিং বা DNA প্রোফাইলিং-ও বলা হয়, একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির DNA নমুনা বিশ্লেষণ করে তার পরিচয় নির্ধারণ করা যায়। প্রত্যেক মানুষের DNA-তে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল থাকে যেগুলোর বিন্যাস (sequence) একান্তই ব্যক্তিগত এবং অন্য কারো সঙ্গে হুবহু মেলে না (যমজ ভাই/বোন ছাড়া)। এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেই DNA ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরি করা হয়।

DNA ফিঙ্গারপ্রিন্টিং এর ধাপসমূহ:

১. DNA সংগ্রহ (Sample Collection): শরীরের যেকোনো কোষ থেকে DNA সংগ্রহ করা হয়। যেমন: রক্ত, চুলের মূল (follicle), লালা (saliva), ত্বক বা টিস্যু ইত্যাদি।

২. DNA নিষ্কাশন (DNA Extraction): প্রথমে কোষ ভেঙে তার ভিতরের নিউক্লিয়াস থেকে DNA আলাদা করে নেওয়া হয়। এরপর এই DNA-কে বিশুদ্ধ করা হয়।

৩. DNA-এর নির্দিষ্ট অংশ কপি করা (PCR - Polymerase Chain Reaction): DNA-তে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল (যেমন STR - Short Tandem Repeats) বিশ্লেষণের জন্য নির্বাচন করা হয়। PCR নামক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই নির্দিষ্ট অংশগুলোকে একাধিক কপি করা হয় যাতে বিশ্লেষণ সহজ হয়।

৪. DNA কাটা (Restriction Enzyme Digestion): বিশেষ এনজাইম ব্যবহার করে DNA-কে নির্দিষ্ট স্থানে কেটে ছোট ছোট টুকরোতে বিভক্ত করা হয়।

৫. জেল ইলেক্ট্রোফোরেসিস (Gel Electrophoresis): এই ধাপে কাটা DNA টুকরোগুলোকে আগারোজ জেল (Agarose Gel) নামক একধরনের জেল এর মধ্যে প্রবেশ করানো হয় এবং তাতে বৈদ্যুতিক প্রবাহ প্রয়োগ করা হয়। এতে DNA টুকরোগুলো নির্দিষ্ট আকার অনুযায়ী ছড়িয়ে পড়ে। ছোট এবং বড় টুকরো গুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়।

৬. ব্যান্ড প্যাটার্ন তৈরি ও বিশ্লেষণ (Band Pattern Analysis): জেল-এর ওপর আল্ট্রাভায়োলেট আলো ফেললে DNA টুকরোগুলো ব্যান্ড আকারে দৃশ্যমান হয়। এই ব্যান্ডগুলো একেকজন ব্যক্তির জন্য একান্ত অনন্য, অর্থাৎ একেকজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট একেক রকম। বিভিন্ন ব্যক্তির DNA ব্যান্ড প্যাটার্ন মিলিয়ে দেখা হয়। যদি দুটি প্যাটার্ন এক হয়, তবে ধরা যায় DNA একই ব্যক্তির।

DNA ফিঙ্গারপ্রিন্টিং-এর ব্যবহার:

অপরাধ তদন্তে: অপরাধস্থলে পাওয়া রক্ত, চুল বা অন্য কোনো নমুনা তুলনা করে অপরাধী শনাক্ত করা যায়।

পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে: সন্তানের সঙ্গে বাবা-মার DNA মিলিয়ে সম্পর্ক প্রমাণ করা যায়।

পরিচয় শনাক্তকরণে: কোনো অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।

বংশগত রোগ চিহ্নিতকরণে: কিছু জেনেটিক সমস্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক।

উপসংহার

DNA ফিঙ্গারপ্রিন্টিং বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার যা জীববিজ্ঞান, ফরেনসিক বিজ্ঞান, এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছে। এটি একটি নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিচয় নির্ধারণ সহজ হয়েছে।

0 comments:

Post a Comment