জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল এর খুঁটিনাটি

জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল কী?

১। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (National Constitutional Council - NCC) রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান কাজ - বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পদে নিরপেক্ষভাবে উপযুক্ত ব্যক্তি নিয়োগে সুপারিশ করা। এনসিসি-র সদস্য হবেন:
  1. রাষ্ট্রপতি;
  2. প্রধানমন্ত্রী;
  3. বিরোধীদলীয় নেতা;
  4. নিম্নকক্ষের স্পিকার;
  5. উচ্চকক্ষের স্পিকার;
  6. বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি; 
  7. বিরোধী দল মনোনীত নিম্নকক্ষের ডেপুটি স্পিকার; 
  8. বিরোধী দল মনোনীত উচ্চকক্ষের ডেপুটি স্পিকার; 
  9. প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিনিধিত্বকারী সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের উভয় কক্ষের সদস্যরা ব্যতীত, আইনসভার উভয় কক্ষের বাকি সকল সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাদের মধ্য থেকে মনোনীত ১ (এক) জন সদস্য। উক্ত ভোট আইনসভার উভয় কক্ষের গঠনের তারিখ থেকে ৭ (সাত) কার্য দিবসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। জোট সরকারের ক্ষেত্রে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল ব্যতীত জোটের অন্য দলের সদস্যরা উক্ত মনোনয়নে ভোট দেওয়ার যোগ্য হবেন।

২। আইনসভা ভেঙ্গে গেলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান এনসিসি সদস্যরা কর্মরত থাকবেন। আইনসভা না থাকাকালীন এনসিসির যারা সদস্য হবেনঃ
  1. রাষ্ট্রপতি;
  2. প্রধান উপদেষ্টা;
  3. বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি;
  4. প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক মনোনীত উপদেষ্টা পরিষদের ২ (দুই) জন সদস্য।

৩। এনসিসি নিম্নলিখিত পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম প্রেরণ করবে:
  1. নির্বাচন কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার;
  2. অ্যাটর্নি জেনারেল;
  3. সরকারি কর্ম কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার;
  4. দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার;
  5. মানবাধিকার কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার;
  6. প্রধান স্থানীয় সরকার কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার;
  7. প্রতিরক্ষা-বাহিনীসমূহের প্রধান;
  8. আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো পদে নিয়োগ।

জাতীয় সাংবিধানিক কমিশনের প্রয়োজনীয়তা

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর একক প্রভাব কাজ করে। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ নিয়োগ নিশ্চিত করতেই জাতীয় সাংবিধানিক কমিশন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা আনবে।

জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) নিয়ে সমালোচনাঃ

  1. সীমাহীন ক্ষমতা:
    এনসিসিকে বহু সাংবিধানিক পদে নিয়োগসহ বহু সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যা একে নির্বাচিত সরকারের চেয়েও শক্তিশালী করে তুলবে।

  2. জবাবদিহির অভাব:
    এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাউন্সিলের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা নেই।

  3. দ্বৈত শাসন ও গঠনতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা:
    এনসিসি কার্যকর হলে সরকারের ওপর আরেকটি শক্তিশালী সরকার তৈরি হবে, যা প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

  4. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা:
    এনসিসি বিচারকদের বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশ করতে পারবে, আবার একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতি এনসিসির সদস্য - এতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

  5. জরুরি অবস্থা জারিতে সীমাবদ্ধতা:
    জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা না রেখে এনসিসির সম্মতির শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

  6. রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব:
    বিএনপি ও তাদের সমমনা ১২টি দল এটি মানতে নারাজ, ফলে এনসিসি নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।

  7. ভোট ও অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণ:
    নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন তাও ঠিক করবে এনসিসি - এতে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

0 comments:

Post a Comment