বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অন্যায় আচরণঃ
১. তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনে অনীহা
তিস্তা নদীর পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে চুক্তি প্রায় সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির
কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে মাত্র একটি নদীর (গঙ্গা) পানিবণ্টন চুক্তি করেছে, বাকি নদীগুলোর
বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
২. সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যাকাণ্ডঃ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) প্রায়শই বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করে।
৩. বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতাঃ বাংলাদেশ ভারতের পণ্য আমদানি করে বিপুল পরিমাণে, কিন্তু ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশে নানা প্রতিবন্ধকতা
রয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ভারতের পক্ষে, যা অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৪. ভারতের কিছু গণমাধ্যমের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারঃ ২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ভারতের বেশ কিছু টিভি চ্যানেল বাংলাদেশের বিষয়ে অসংখ্য মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, গুজব ছড়ায়। এতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতা বাড়ে।
৫. পতিত সরকারের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে ভারতের কিছু মহল পতিত হাসিনার সরকারকে সমর্থন দেয়, যা বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার সম্পুর্ণ বিরুদ্ধে।
৬. আন্তঃদেশীয় যোগাযোগে একমুখী সুবিধাঃ ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে (ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট),
কিন্তু বাংলাদেশ তেমন কোনো সুবিধা পাচ্ছে না।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের নতুন সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায্যতা, সমমর্যাদা, বহুমাত্রিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থা। ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গভীর আন্তসম্পর্কের কারণে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে গভীরভাবে জড়িত।
১. নির্মোহ ও বাস্তব মূল্যায়ন প্রয়োজনঃ ভারতের উচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখানো। সম্পর্ক যেন নির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক না হয়, বরং জনগণের সঙ্গে গভীর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।২. বিতর্ক নয়, সমাধানমুখী সহযোগিতাঃ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর, যেমন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বাধা এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌথ সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে হবে।
৩. গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গিঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সস্তা ভারতবিরোধিতার পথে না গিয়ে, দায়িত্বশীল ও পরিপক্ব অবস্থান গ্রহণ করা। একইভাবে ভারতের গণমাধ্যম ও সরকারকেও বাংলাদেশের বিষয়ে সংবেদনশীল ও তথ্যনির্ভর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
৪. ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষাঃ উভয় দেশেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা একটি অভিন্ন চ্যালেঞ্জ। এই ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উস্কানিমূলক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি। ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিবেশ রক্ষা দুই দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য।
৫. সামাজিক ও নাগরিক সম্পৃক্ততাঃ এই সম্পর্ক কেবল সরকারের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও শিক্ষাবিদদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। একটি ইতিবাচক, মানবিক ও সহনশীল পরিবেশ গড়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সেতু গড়া সম্ভব।
সর্বোপরি, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে বাস্তববাদী, দায়িত্বশীল, এবং জনগণের কল্যাণনির্ভর। সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সহযোগিতার মনোভাবই নতুন সম্পর্ক গঠনের মূল চাবিকাঠি। এটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

0 comments:
Post a Comment