মধ্যম আয়ের ফাঁদ কী? বাংলাদেশ কি মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়েছে?


মধ্যম আয়ের ফাঁদ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা যেখানে কোনো দেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হয়, কিন্তু দীর্ঘদিন মধ্যম আয়ের দেশে থাকার পরেও উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে না। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আটকে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

মধ্যম আয়ের ফাঁদের উদাহরণঃ

  • ল্যাটিন আমেরিকাঃ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ইত্যাদি দেশ।
  • এশিয়াঃ মালেশিয়া থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশ।
ক্যাটাগরি মাথাপিছু আয়
নিম্ন আয় =< ১১৪৫ ডলার
নিম্ন মধ্যম আয় ১১৪৫ - ৪৫১৬ ডলার
উচ্চ মধ্যম আয় (ফাঁদ) ৪৫১৬ - ১৪০০৫ ডলার
উচ্চ আয় ১৪০০৫+ ডলার

মধ্যম আয়ের ফাঁদের বৈশিষ্ট্যঃ

১. উৎপাদনশীলতা স্থবিরতাঃ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার অভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না।

২. নিম্ন মজুরির উপর নির্ভরশীলতাঃ সস্তা শ্রমের সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায় কিন্তু দক্ষ শ্রমশক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তির অভাবে প্রতিযোগিতা হারায়।

৩. আয়বৈষম্য ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বলতাঃ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধা কিছু মানুষের কাছে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে না। অভ্যন্তরীণ বাজার-সম্প্রসারণের অভাবে শিল্পায়ন মন্থর হয়।

৪. দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও নীতিগত সমস্যাঃ দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করে।

৫. প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাঃ কৃষি বা খনিজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল অর্থনীতি - বৈশ্বিক বাজার মূল্যহ্রাসের প্রতি সংবেদনশীল হয়।

৬. পরিবেশগত চাপঃ দ্রুত শিল্পায়নের ফলে পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের উপর চাপ পড়ে, যা টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করে।

মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার কারণঃ

১. উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিপুল ঋণভারঃ গতবছর (২০২৪) উন্নয়নশীল বিশ্ব তাদের মোট ঋণের উপর ১.৪ লাখ কোটি ডলার শুধু সুদ হিসেবে পরিশোধ করেছে। দরিদ্রতম দেশগুলো দিয়েছে প্রায় ৯৬০ কোটি ডলার।

২. জনসংখ্যায় বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক সংখ্যাবৃদ্ধিঃ বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশই বৃদ্ধি এবং তার দুই-তৃতীয়াংশই অধিকাংশই উন্নয়নশীল বিশ্বে বাস করে।

৩. প্রতিবন্ধকতামূলক বাণিজ্যনীতিঃ
  • WTO মধ্যম আয়ের দেশে শুল্ক বাড়িয়ে দেয়।
  • উন্নত দেশগুলো মধ্যম আয়ের দেশগুলোর রফতানির বিরুদ্ধে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এবং সেই সঙ্গে শুল্ক-বহির্ভূত নানা প্রতিবন্ধকতারও মুখোমুখি করে।

৪. সল্প পুঁজিঃ এইসব দেশে পুঁজি অনেক কম, আবার এই কম পুঁজি ব্যবহৃত হয় খুব অদক্ষ্যভাবে।

৫. প্রাকৃতিক সম্পদঃ প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা।

৬. স্থবির প্রবৃদ্ধিঃ এইসব দেশের অর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি প্রায়শই স্থবির থাকে।

৭. উৎপাদনের সীমাবদ্ধতাঃ এইসব দেশে উৎপাদনশীল কারখানা বিস্তার লাভ করে না।

বাংলাদেশ কি মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়েছে?

বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়া নিয়ে অর্থনীতিবিদদের নানা মত রয়েছে। বনিক বার্তায় সেলিম জাহান বলেছেন, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হয়েছিল। তখন থেকেই এই দেশ নিজের অজান্তেই মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়েছে। এ প্রক্রিয়ায় তিনি ৬টি উপসর্গ চিহ্নিত করেনঃ
  1. উৎপাদন ও কর্ম নিয়োজনের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক
  2. দেশের শিল্প খাতের স্থবিরতা ও সংকোচন
  3. জাতীয় আয়ে রফতানি খাতের অপর্যাপ্ত অবদান
  4. স্বাস্থ ও শিক্ষা খাতে অপ্রতুল বিনিয়োগ
  5. বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবিরতা
  6. সুশাসনের অভাব
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বাংলাদেশের সামনের ধাপ দুইটি, উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়া, যার জন্য দরকার ৪৫১৬ ডলার মাথাপিছু আয় করা। তারপর উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। যার জন্য দরকার মাথাপিছু আয় ১৪০০৫ ডলার। বর্তমানে ২৮২০ ডলার আয় নিয়ে ৫-৬% মানুষের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধির উপর ভর করে এ দেশ ৭-৯ বছরের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌছাবে, যা ঘটবে ২০৩১ সালে। কিন্তু উন্নত দেশ বা উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে কমপক্ষে ২৭ বছর সময় লাগবে। যদি মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি ৬% ধরা হয়। ২৭ বছর পর অর্থাৎ ২০৫১ সালে স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ উচ্চ আয়ের দেশ এ পরিণত হবে। কিন্তু মেধাভিত্তিক সবল প্রতিষ্ঠান গড়ে না তুললে এ মহেন্দ্রক্ষণের আগমন হবে আরো বিলম্বিত। তখন কেউ কেউ একে ফাঁদের উপস্থিতি বলে কলঙ্ক দেবেন। হাজারটা বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি - যাদের সব কটিকে ফাঁদে ফেলার কাজটা মোটেও সম্ভব নয়। তাই ফাঁদের ভীতিও বাংলাদেশের জন্য এক উদ্ভট রূপকথামাত্র।

0 comments:

Post a Comment