বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি বা সংক্ষেপে পিআর পদ্ধতি নিয়ে এক নতুন বিতর্ক ঘনিয়ে উঠেছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষত ছোট দলগুলো, এই পদ্ধতি চালুর পক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, এই পদ্ধতি গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত করবে। অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষক ও বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিগুলো একে দেখছে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিপর্যয়ের নতুন সূত্র হিসেবে।
পিআর পদ্ধতির মৌলিক ধারণা
পিআর পদ্ধতিতে কোনো দলের সংসদীয় আসন নির্ধারিত হয় সেই দলের প্রাপ্ত জাতীয় ভোটের অনুপাতে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো দল ২০% ভোট পায়, তারা পাবে ২০% আসন। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের পাশাপাশি সংখ্যালঘুদেরও সংসদে উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
এই পদ্ধতি এখন ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে এটি রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণের ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই একই বাস্তবতায় অবস্থান করছে?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কেন?
১। অস্থিতিশীল ও দুর্বল জোট সরকার
পিআর পদ্ধতিতে সাধারণত এককভাবে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। ফলস্বরূপ, জোট সরকার গঠন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, এখানে জোট রাজনীতি মানেই সুবিধাবাদ, আদর্শ নয়। ফলে সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২। সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা
বহুদলীয় সংসদে নীতিনির্ধারণে মতপার্থক্য, বিবাদ এবং কালবিলম্ব অনিবার্য। এতে নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং নীতিমালার বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
৩। জনপ্রতিনিধিত্ব ও দায়বদ্ধতার সংকট
পিআর পদ্ধতিতে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, বরং দলকে ভোট দেন। এতে ভোটারের সঙ্গে প্রতিনিধির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ভেঙে যায়। সংসদ সদস্যরা দায়বদ্ধ হয় দলের প্রতি, জনগণের প্রতি নয়। গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য জবাবদিহিতার বড় ক্ষতি হয়।
৪। দলীয় একনায়কত্বের বিস্তার
পিআর পদ্ধতিতে সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন থাকে দলের হাতে। এতে দলীয় প্রধানের কর্তৃত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে দলীয় স্বৈরতন্ত্র আরও মজবুত হয়। এ প্রবণতা গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তোলে।
৫। প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। দুর্নীতি, দলীয়করণ ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পিআর পদ্ধতির মতো জটিল মডেল বাস্তবায়ন মানে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাকে ডেকে আনা।
৬। সংসদে দরকষাকষি ও ক্ষমতার রাজনীতি
সংসদ হবে খণ্ডিত, বহু দল একে অপরের সঙ্গে দলগত ও ব্যক্তিগত স্বার্থে দর-কষাকষি করবে। এতে সংসদ হয়ে উঠবে নীতিহীন রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চ, যেখানে উন্নয়ন বা সেবার চেয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি বড় হয়ে উঠবে।
৭। সংবিধানগত প্রতিবন্ধকতা
বর্তমান সংবিধানে পিআর পদ্ধতির বিধান নেই। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া এই পদ্ধতি চালু করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে হঠাৎ এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মূলত নির্বাচনী পদ্ধতির ব্যর্থতা নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অসুস্থতা। যতদিন নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে না উঠবে, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে না, সহনশীল রাজনৈতিক চর্চা শুরু হবে না, তত দিন কোনো পদ্ধতিই কার্যকর হবে না, সে যতই গণতান্ত্রিক হোক না কেন।
অতএব, পিআর পদ্ধতি গণতন্ত্রে সংখ্যাগত ভারসাম্য আনতে পারলেও, তা রাজনৈতিক ভারসাম্য, স্থিতিশীলতা ও দায়বদ্ধতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ব, সংঘাতমুখী এবং দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর দেশে পিআর পদ্ধতি সমাধানের চেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই, আজকের বাস্তবতায় পিআর পদ্ধতি কোনো যাদুকরী সমাধান নয়, বরং এটি হতে পারে আরেকটি রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।

0 comments:
Post a Comment